মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা শুধু গোলাবারুদের লড়াই নয়, এটা সমানভাবে বয়ানের যুদ্ধ, বিশ্বাসের যুদ্ধ এবং তথ্যের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। “গ্রেটার ইসরায়েল”, “মেসিয়াহ”, “সেকেন্ড কামিং”, “প্রক্সি ওয়ার”, এই শব্দগুলো এখন কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বা একাডেমিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই, এগুলি এখন সবার মুখে মুখে আর তা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
“গ্রেটার ইসরায়েল” ধারণাটা বহুদিন ধরেই বিতর্কিত। ধর্মীয় গ্রন্থের একটা প্রতিশ্রুতিকে আজকের রাষ্ট্রনীতির সাথে সরাসরি মিলিয়ে দেখা সহজ, কিন্তু তা সবসময় বাস্তবতার প্রতিফলন নয়। ইসরায়েলের ভেতরে যেমন চরমপন্থী কণ্ঠ আছে, তেমনি কিছু বাস্তববাদী রাজনীতিও আছে। তবুও এই ধারণা এখন এমনভাবে প্রচারিত হচ্ছে যেন এটা একটা সক্রিয়, সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় প্রকল্প, যা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি সরলীকৃত ব্যাখ্যা।
একইভাবে, ইহুদি “মেসিয়াহ”, খ্রিস্টান “অ্যান্টিক্রাইস্ট” এবং ইসলামের “মাহদি”, এই তিনটা ভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক ধারণাকে এক সরল রেখায় দাঁড় করানোও একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। এতে যেমন বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তেমনি পারস্পরিক অবিশ্বাসও বাড়ে। ধর্মীয় বিশ্বাসকে যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন তা সহজেই সংঘাতের আগুনে 'ঘি' ঢালার মতো হয়ে ওঠে।

তবে এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের একটা অংশ, ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের মধ্যে এই ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। জেরুজালেম, তৃতীয় মন্দির, আর্মাগেডন এই শব্দগুলো তাদের কাছে শুধু প্রতীক নয়, বরং ভবিষ্যতের পূর্বাভাস। এই বিশ্বাস রাজনীতিতে প্রতিফলিত হলে তা আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করবেই যা আমরা এখন প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি।
অন্যদিকে, বর্তমান সংঘাতকে “যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল বনাম রাশিয়া–চীন–ইরান” সরল ব্লকে ফেলা যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে রাশিয়া বা চীন এখনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। তবে বিভিন্ন রিপোর্টে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, রাশিয়া গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে পারে, চীন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সমর্থন জোগাতে পারে। এটা সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং ছায়াযুদ্ধ, যেখানে অংশগ্রহণ অস্বীকারযোগ্য (deniable), কিন্তু প্রভাব বাস্তব।
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালীতে ন্যাটোর সরাসরি অনুপস্থিতি বা যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকার, এসবকেও সরলভাবে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা ভুল হবে। বরং এটা একটা হিসাবি সংযম, যেখানে প্রত্যেক পক্ষই সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে চায়, কিন্তু প্রভাব বিস্তার থেকেও সরে আসতে চায় না।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্যের যুদ্ধ। কে কোথায় চিকিৎসা নিচ্ছেন, কে কোথায় হামলা চালিয়েছে, কে কার সাথে সমন্বয় করছে, এই সব খবরের বড় অংশই এখন যাচাইহীন, পরস্পরবিরোধী এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন গোলাবারুদ ব্যবহার হয়, তেমনি তথ্যও একটা মারাত্মক অস্ত্র।
সব মিলিয়ে, বর্তমান বিশ্ব এক নতুন বাস্তবতার দিকে যাচ্ছে, যেখানে কোনো একক শক্তি আর পুরো নিয়ন্ত্রণে নাই, কিন্তু কেউই পুরোপুরি বাইরেও নেই। এটা এক বহুমেরুকেন্দ্রিক, বহুস্তরীয় সংঘর্ষের যুগ, যেখানে সত্য, বিশ্বাস ও কৌশল সবকিছুই একে অপরের সাথে মিশে গেছে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, শব্দের ভিড়ে সত্যকে আলাদা করা, এবং বিশ্বাসের উত্তাপে বাস্তবতাকে হারিয়ে না ফেলা।
বিশ্লেষণ ধর্মী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক, শীতল যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য আজ আর নাই। অর্থাৎ হরমুজ প্রণালী সে খুলে দিবে-বন্ধ রাখবে সেটা তার উপরে নির্ভর করছে না। বিশ্ব এখন বহুমেরুকেন্দ্রিক, ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আর একক নিয়ন্ত্রক নয়। এই নতুন পরিস্থিতি প্রতিটা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে আরও জটিল এবং হিসাবসাপেক্ষ করে তুলেছে। আশা করি এই বৈশ্বিক বিপদ (মার্কিন-ইসরাইল দাদাগিরি) থেকে পৃথিবীর সব দেশ খুব দ্রুত বার হয়ে আসুক।
লিখেছেন :