ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে—হেজেমনি। এটি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার কর্তৃত্ব নয়, বরং মানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল ও আধিপত্যের ভিত্তি। আজকের ভারতে হিন্দুত্ববাদী হেজেমনি ঠিক এই কাজটাই করছে—রাষ্ট্রীয় নীতি, মিডিয়া, আইনশৃঙ্খলা সবই এই আদর্শের সেবায় নিয়োজিত হয়ে পড়েছে।
এই আধিপত্য বোঝার জন্য আমাদের দেখতে হবে রাষ্ট্র কীভাবে ধর্মীয় উন্মাদনাকে উৎসাহিত করছে এবং নাগরিক অধিকারকে দমন করছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী দিল্লি থেকে বৃন্দাবন পর্যন্ত পদযাত্রা শুরু করেন। হাজার হাজার মানুষ, ঢাক-ঢোল, পতাকা, মিডিয়ার লাইভ কাভারেজ—সবই রাষ্ট্রীয় সহায়তায় চলল। দিল্লি পুলিশ বিশেষ ট্রাফিক অ্যাডভাইজরি দিল, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করল।
কিন্তু একই সময়ে দিল্লির ইন্ডিয়া গেট-এ শতাধিক নাগরিক “Breathing is killing us” স্লোগান দিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেন। তাদের মধ্যে ছিল শিশু, বৃদ্ধ, সাধারণ মানুষ। অথচ পুলিশ Section 163 BNSS অনুযায়ী প্রায় ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করল।
এই হেজেমনি কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি ভোটাধিকারেও প্রভাব ফেলছে। বিজেপি নেতারা দাবি করেছেন দেশে কোটি কোটি ভুয়ো ভোটার রয়েছে। কিন্তু RTI-এর মাধ্যমে জানা যায়, ১৪২ কোটি আধার কার্ডের মধ্যে মাত্র ১১২৭২ জন বিদেশি নাগরিকের কাছে আধার আছে। তাহলে কোটি কোটি ভুয়ো ভোটার কোথায়? আবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর প্রেস কনফারেন্স অনুযায়ী ভোটার লিস্টের মধ্যেই কারচুপি দেখতে পাওয়া যায়।আসলে পুরো কাঠামোটারি একটা অবনমণ দেখা যায় এই সময় দাঁড়িয়ে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি—জনগণের ভোটাধিকার—এভাবেই হেজেমনির শিকার হয়।
ধর্মীয় উন্মাদনা ও ভোট চুরির বিভ্রান্তির পাশাপাশি সন্ত্রাসও হেজেমনির একটি বড় হাতিয়ার। ২০১৬ সালের উরি হামলা, ২০১৯ সালের পুলওয়ামা বিস্ফোরণ, ২০২৪ সালের পেহেলগাম হামলা এবং ২০২৫ সালের দিল্লির লালকেল্লা বিস্ফোরণ—সবই বিজেপি শাসনে ঘটেছে।
প্রতিবারই এই হামলাগুলোকে জাতীয়তাবাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ভয় ছড়িয়ে, বিভ্রান্তি তৈরি করে, মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে আসল সমস্যা থেকে—দূষণ, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি।
| বছর | ঘটনা | স্থান | নিহত |
|------|-------|--------|-------|
| ২০১৬ | উরি হামলা | জম্মু ও কাশ্মীর | ১৯ |
| ২০১৯ | পুলওয়ামা বিস্ফোরণ | জম্মু ও কাশ্মীর | ৪০ |
| ২০২৪ | পেহেলগাম হামলা | জম্মু ও কাশ্মীর | ২৬ |
| ২০২৫ | লালকেল্লা বিস্ফোরণ | দিল্লি | ১৩ |
এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে সন্ত্রাসকে কেবল নিরাপত্তার ব্যর্থতা হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, হিন্দুত্ববাদী হেজেমনি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—ধর্মীয় উন্মাদনা, ভোট চুরির বিভ্রান্তি এবং সন্ত্রাসের রাজনৈতিক ব্যবহার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নাগরিক অধিকার দমন। এই চারটি কৌশল মিলে একটি পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যাতে জনগণ বিভ্রান্ত থাকে এবং ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে পারে।
লিখেছেন :