এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি SIR নিয়ে সরগরম। সামনে বিধানসভার ভোট, ফলে পারদ যে আরও চড়বে বলার অপেক্ষা রাখে না। সামান্য একটি কলমের খোঁচায় একটি সত্যি মানুষ নিমেষে নেই-মানুষ হয়ে যেতে পারে এমনই রাষ্ট্রযন্ত্রের আদব-কায়দা— এমন ধরনের ভোজবাজিতে কোনও সংবেদনশীল মানুষের সায় দেওয়া সাজে না। কিন্তু একজন সংখ্যালঘু সমাজের মানুষ হিসেবে খুব মনেপ্রাণে চাই পশ্চিমবঙ্গে SIR হোক। পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশি মুসলমান এবং রোহিঙ্গাতে ভ'রে গেছে— বিজেপির এই যে অপপ্রচার এবং মুসলমান-বিদ্বেষ ছড়ানো তার পর্দা ফাঁস হওয়া দরকার বলে মনে করি।
'৪৭-এর স্বাধীনতার সময় এক্সোডাস বা মহানিষ্ক্রমণ তো হয়েছেই। সরকার জনসাধারণকে অপশন দিয়েছিল। কিন্তু তারপর কি স্থানান্তর থেমে গেছে? সহজ উত্তর হল, না। '৫৬, '৬৬, এবং আরও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে পশ্চিমবঙ্গে বহু মানুষের অনুপ্রবেশ ঘেটেছে— এর সামান্যই আইনি প্রক্রিয়ায়, বাকিটা হয়েছে চোরাগোপ্তাভাবে। (এই শেষ বাক্যে 'স্থানান্তর' না-লিখে 'পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ' কথাটা লেখা এই কারণেই যে, যে বিপুল সংখ্যক মুসলমান মানুষ এ বাংলা থেকে বাংলাদেশে চলে গেছেন তাদেরকে আপাতত এই আলোচনা থেকে বাইরে রাখা হল)। এরপর '৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ; ঐ সময় ভারতবর্ষের ভূমিকা গর্ভজননী মায়ের মতোই। যদিও নতুন প্রজন্মের অনেক বাংলাদেশিকেই (সম্ভবত পড়াশোনার অভাব এবং ছাগুবৃত্তির কারণে) অহেতুক ভারতবিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করতে দেখা যায়। যাইহোক মূল কথায় ফিরি— গৃহযুদ্ধ, নির্যাতন ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে আনুমানিক প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি মানুষ ভারতবর্ষে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় এবং অন্য রাজ্যে বাংলাদেশি শরনার্থী আশ্রিত হলেও পশ্চিমবঙ্গে শরনার্থী আশ্রয়ের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ; এক কোটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ। এই শরনার্থী মানুষদের অধিকাংশ মানুষই ধর্মে হিন্দু মানুষ। এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে শরনার্থী মানুষদের মধ্যে কিছু মানুষ (মূলত ধর্মে মুসলমান) ওদেশে ফিরে গেলেও বেশিরভাগ মানুষই দুর্ভাবনামুক্ত, উন্নততর জীবনের লক্ষ্যে এখানেই থেকে গেছেন।
এখন '৭১ পর্যন্ত এই যে টালমাটাল, অস্থির সময়— যদি আলোচনার সুবিধার্থে 'ধরেও' নিই যে, এই পর্যন্ত সব অনুপ্রবেশ বৈধ— তাহলে প্রশ্ন আসবে এরপর কি আর অনুপ্রবেশ হয়নি? উত্তর হল, হয়েছে এবং প্রচুর সংখ্যকই হয়েছে। এবার প্রশ্ন হল, যে মানুষদের অনুপ্রবেশ হয়েছে, তারা কোন্ ধর্মের মানুষ? এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, কোন্ কোন্ জেলায় বেশি অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে? এই বিষয়ের গবেষকরা নির্দিষ্ট করে এর উত্তর দিতে পারবেন, তবে আমার অনুমান সবচেয়ে বেশি অনুপ্রবেশ হয়েছে নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ এবং কোচবিহার জেলায়। আর ধর্ম? (এ-সমস্ত ক্ষেত্রে তো অনুপ্রবেশকারীর ধর্ম নয় বরং সমস্যাটা বিচার্য হওয়া উচিত কিন্তু বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার এবং দেশের ঘোষিত সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল যেহেতু ধর্ম দিয়েই সবটা বিচার করেন তাই ধর্মের হিসেবটাও প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে।) অনুমান বলছে অন্তত ৯০-৯৫ শতাংশ অনুপ্রবেশকারী মানুষ ধর্মে হিন্দু।
এখন যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে SIR হয় এবং '৭১-এর সময় পর্যন্ত সব অনুপ্রবেশ বৈধ 'ধরেও' নেওয়া হয়; পরবর্তী সময়ের অনুপ্রবেশকারীরা নিশ্চিতভাবে সমস্যায় পড়বেন। কারণ সব ডকুমেন্ট সবাই তৈরি করে ফেলেছেন আমার তা মনে হয় না, কিছু লোক নিশ্চয় করে ফেলেছেন। যে অল্প সংখ্যক মুসলমান এর মধ্যে আছে তারা বাদ যাবেন এবং বাদ যাওয়াই উচিত 'ধরে নিচ্ছি'। কিন্তু বাকি অধিকাংশ মানুষ যারা ধর্মে হিন্দু তাদের কী হবে? বিজেপি কি তাদেরকেও আসামের মতো ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠাবে? প্রশ্নটা এখানেই। সারাক্ষণ ধর্ম ধর্ম খেলা বিজেপির বিধায়ক মতুয়া অসীম সরকার কি সেই অভিপ্রায় বুঝতে পেরেই সম্প্রতি কান্নাকাটি শুরু করেছেন?
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আজ ২০২৫ সালে কি অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়ে গেছে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আপনার পরিচিত যে সমস্ত মানুষ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাস করেন তাদের জিজ্ঞেস করুন উত্তর পেয়ে যাবেন। এমনকি তারা কোন্ ধর্মের মানুষ সেই উত্তরও পাবেন। (সাত বছরের অধিক একটি সীমান্তবর্তী অঞ্চলের স্কুলে চাকরি করেছি, আমারও কিছু অভিজ্ঞতা আছে বৈকি।) এ-বঙ্গে বিজেপির এক সাংসদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হল, তিনি বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলা থেকে এদেশে পড়তে এসে আর ফেরত যাননি, অর্থাৎ অনুপ্রবেশকারী হিসেবেই রয়ে গেছেন। সীমান্তবর্তী আরও কয়েকজন বিধায়কও সীমান্ত পার করে এসেছেন বলে অভিযোগ শোনা যায়। অথচ তারাই অনুপ্রবেশ ইস্যু নিয়ে মানুষকে ক্ষেপাচ্ছেন! এদেশের সংখ্যালঘু সমাজের সাধারণ মানুষ যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনও সম্পর্কই নেই তাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছেন।
এখন প্রশ্ন হল এদেশের সাধারণ মুসলমানরা কি SIR-এর জন্য সমস্যায় পড়বেন? মনে হয় না। কারণ এদের মূল সমস্যা কাগজের নয়। মূল সমস্যা হল, পড়াশোনা এবং সচেতনতার অভাবে বিভিন্ন ডকুমেন্টে বিভিন্ন নামের বানান হয়ে রয়েছে। কিন্তু এই সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে ট্রিট করলে এক বড়ো অংশের পিছিয়ে পড়া হিন্দু মানুষও এই সমস্যা ফেস করবেন। এছাড়া খুব প্রান্তিক মুসলমান এবং হিন্দু উভয় ধর্মেরই অল্প সংখ্যক মানুষ হয়তো সমস্যায় পড়তে পারেন।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ শুধু সমতলের সমস্যা নয়, উপরে পাহাড়েও (দার্জিলিং, কালিংপং) এই সমস্যা আছে। কিন্তু সেখানে না-আছে আছে নির্দিষ্ট সীমান্ত, নির্দিষ্ট বেড়া, তাছাড়া অনুপ্রবেশকারীরা ধর্মে মুসলমানও নয়; নেপাল থেকে আগত মানুষেররা হয় বৌদ্ধ নয় হিন্দু। এবং সর্বোপরি সেখানে বিজেপি আছে। অতএব সব চাঙ্গাসি! সেখানে বিদ্বেষ ছড়ানোর কোনও ব্যাপার নেই, কারণ বিদ্বেষ শুধুমাত্র ভারতীয় মুসলমান, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের জন্য বরাদ্দ!
এবার শেষ কথা, এই যে বাংলাদেশ থেকে এত হিন্দু অনুপ্রবেশ হয়েছে এবং রোজ হচ্ছে এই নিয়ে এ-দেশের এ-রাজ্যের সাধারণ সংখ্যালঘু মানুষেরা তো কিছু বলছেন না। তারা বিদ্বেষও ছড়াচ্ছেন না। আর পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে মানুষ তো এমনি আসছেন না, বেশিরভাগ মানুষ জ্বালায় পড়েই আসছেন ('বেশিরভাগ' লেখার কারণ আছে কিন্তু সে আলোচনার ক্ষেত্র এটা নয়)। কিন্তু প্রশ্ন হল, একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল ক্রমাগত, প্রতিনিয়ত এ-রাজ্যের মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা এবং বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন অথচ বড়ো সংখ্যক তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষদের কাছে থেকে পর্যাপ্ত প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে না কেন? তারাও কি তবে শুভেন্দু-সিনড্রমে আক্রান্ত হয়েছেন? কিন্তু মনে রাখবেন, ভোট আপনি যাকে খুশি দিন, এমনকি বিজেপিকেও দিতে পারেন কিন্তু চাড্ডি হয়ে যাবেন না। কারণ চাড্ডিদের ডিএনএ আলাদা, গণ্ডগোলে! ঐ ডিএনএ একবার শরীরে ঢুকে গেলে আপনি একই সঙ্গে গান্ধি এবং গডসে-র পুজো করতে শুরু করবেন।
আর শেষের শেষ কথাটি এই যে, যে নেত্রী এক সময় পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ সমস্যা নিয়ে সংসদে বিরাট চিলচিৎকার জুড়ে ছিলেন তিনিও এখন অজানা কারণে নির্দিষ্ট অবস্থান নিতে পারছেন না; না-পক্ষে, না-বিপক্ষে। কিন্তু সেই আলোচনাটি যেহেতু আর একটু বেশি পরিসর দাবি করে তাই এখন আপাতত সেই আলোচনায় যাওয়া গেল না।
প্রসঙ্গত রোহিঙ্গা নিয়েও কয়েকটি কথা বলা দরকার। 'রোহিঙ্গা' বলতে মূলত মায়ানমারের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মুসলমান বাসিন্দাদের বোঝায় যাদের ভাষার সঙ্গে বাংলাভাষার বেশ খানিকটা মিল আছে। আরাকান রাজসভার কথা এ-প্রসঙ্গে নিশ্চয় মনে পড়ার কথা— পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণ পূর্ব থেকে বার্মার রাখাইন অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাজসভা এক সময় বাংলাভাষা চর্চার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। দৌলতকাজী, সৈয়দ আলাওলদের কাব্য-সাফল্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিস্তৃত অধ্যায় জুড়েই আলোচনা করা হয়। সৈয়দ আলাওলের 'সিন্ধুতীরে' কবিতা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সিলেবাসে মাধ্যমিক স্তরে পঠিত হয়। কিন্তু সেই উত্তরসূরীতা সংস্কৃতিগতভাবে থাকলেও ভৌগলিকভাবে ছিন্ন হয়েছে তো অনেক আগেই। ব্রহ্মদেশ বা মায়ানমার ব্রিটিশ ভারত থেকে বিছিন্ন হয়েছে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছে ১৯৪৮ সালে। বর্তমানে ভারতবর্ষের অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, মিজোরামের সঙ্গে মায়ানমারের সীমান্ত থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে কোথাও মায়ানমারের বর্ডার সংযোগ নেই। অথচ প্রচার করা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে রোহিঙ্গা মুসলমানে ভরে যাচ্ছে। বাংলাদেশের কক্সবাজার বর্তমানে সব চেয়ে বড়ো রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির; কিন্তু সেটি একেবারে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে মায়ানমার ঘেঁষে। তবে কি রোহিঙ্গারা পুরো বাংলাদেশ আড়াআড়ি অর্থাৎ পূর্ব-পশ্চিমে পাড়ি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করছেন? অর্থাৎ বিদ্বেষপন্থীরা কি সীমান্ত-সেনাদের ব্যর্থতার দিকেই আঙ্গুল তুলছেন? নাকি রোহিঙ্গারা আকাশ থেকে বৃষ্টির মতোন ঝরে পড়ছেন? শুধুমাত্র মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য বিজেপির এই যে অপপ্রচার, তা কি ভারতীয় বায়ুসেনারও অপমান নয়?
.
ছবি ইন্টারনেটে থেকে প্রাপ্ত। প্রতীকী।
লিখেছেন :