একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি এক অনন্য সংকটের মুখোমুখি। একদা ইরানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ খাতামি জাতিসংঘের মঞ্চ থেকে ‘সভ্যতাগত সংলাপ’-এর ডাক দিয়ে বিশ্ববাসীকে শান্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পথ দেখিয়েছিলেন। অন্যদিকে, মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি হুমকি দিচ্ছেন পুরো একটি সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করার। 'আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা মারা যাবে, আর কখনো যাকে ফিরিয়ে আনা যাবে না' লিখেছেন তিনি তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে, সেইসঙ্গে যোগ করেছেন, 'আমি এটা করতে চাই না, কিন্তু সম্ভবত এটাই হবে'। একদিকে সভ্যতার মাঝে সেতুবন্ধনের আহ্বান, অন্যদিকে পারমাণবিক হুমকির মাধ্যমে একটি অন্যতম প্রাচীন সভ্যতাকে ধ্বংস করার উন্মত্ততা—এই দুই মেরুতে আজ দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব।
ট্রাম্পের এই 'পুরো সভ্যতা ধ্বংসের' হুমকি (যা আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার পরিভাষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ) শুধু ইরানের ভূখণ্ডের ওপর হামলার হুমকি নয়, বরং সভ্যতাগত সংলাপ ও সহাবস্থানের সকল মানবিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত। ট্রাম্পের এই ধ্বংসাত্মক বক্তৃতা খাতামির ‘সভ্যতাগত সংলাপ’-এর চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
‘সভ্যতাগত সংলাপ’: খাতামির শান্তির দ্বার উন্মোচন
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘর্ষ’ তত্ত্ব যখন বিশ্বময় তুমুল আলোচিত, তখন ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ খাতামি তুলে আনেন এক অভিনব পাল্টা প্রস্তাব। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, সভ্যতাগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, জ্ঞান ও শিল্পের বিনিময়ের মাধ্যমে গঠনমূলক সভ্যতাগত সংলাপ সম্ভব। খাতামির মতে, সংলাপের মূল ভিত্তি হলো একে অপরকেশোনা। 'কথা বলা এবং শোনা একটি দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টা যা সত্যের কাছাকাছি যেতে এবং নতুন বোঝাপড়া অর্জনে সহায়তা করে' এই ছিল তার মত।

এই দর্শনের ভিত্তি ছিল ইরানের বহুমুখী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—প্রাচীন পারস্য, ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার সমন্বয়। খাতামি বিশ্বাস করতেন, সংলাপের মাধ্যমেই বিশ্বায়নের এই যুগে এক নতুন নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, যেখানে ‘আমি’ ও ‘অন্য’-এর মধ্যে বিভেদ দূর হবে। সংলাপের এই ধারণা ছিল ‘শক্তি’ এবং ‘দখল’-এর নীতি থেকে ‘সহমর্মিতা’ এবং ‘সহানুভূতি’র দিকে যাত্রার আহ্বান। খাতামির এই আহ্বান জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত হয় এবং ২০০১ সালকে ঘোষণা করা হয় ‘সভ্যতাগত সংলাপ বর্ষ’ হিসেবে।
ইরানের বহু-সাংস্কৃতিক ও বহু-ধর্মীয় ইতিহাস (প্রাচীন জরথুষ্ট্রীয়, ইসলামী ও আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের সমন্বয়) খাতামির এই দর্শনকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছিল। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে ইরানের পরিচয় ‘ইরানীয়-ইসলামী’—একটি সমন্বয় যা শুধু সহাবস্থানই নয়, পরস্পর থেকে শেখার আহ্বান জানায়।
ট্রাম্পের ‘সভ্যতা ধ্বংসের’ বক্তৃতা: সংলাপের অন্তিম পরিণতি?
খাতামির স্বপ্নের একেবারে বিপরীত চিত্র দেখা যায় ট্রাম্পের বক্তব্যে। গত ৭ এপ্রিল, ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করে স্পষ্ট হুমকি দেন: 'আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা মারা যাবে, যাকে আর কখনো ফিরিয়ে আনা যাবে না। আমি এটা করতে চাই না, কিন্তু সম্ভবত এটাই হবে'। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেন এবং হুমকি দেন, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে না দেয় ও একটি চুক্তি না করে, তাহলে তিনি ইরানের প্রতিটি সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেবেন। এই হুমকি কেবল সামরিক পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট জাতি ও সংস্কৃতির অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা একে গণহত্যার প্রচারণা এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, যা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন ও জেনেভা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
ট্রাম্পের এই হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ব্যাপক নিন্দার সৃষ্টি করেছে। ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার একে 'একটি অত্যন্ত অসুস্থ ব্যক্তির বক্তব্য' বলেছেন। এমনকি তার ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্জোরি টেলর গ্রিন পর্যন্ত একে 'অশুভ আচরণ ও পাগলামি' আখ্যা দিয়ে ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের দাবি জানান। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র। পোপ লিও এই হুমকিকে গণহত্যার হুমকি হিসেবে নিন্দা জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক একটি বিবৃতিতে ট্রাম্পের হুমকিকে আতঙ্কজনক বলে নিন্দা জানান এবং মনে করিয়ে দেন যে যুদ্ধেরও নিয়ম রয়েছে, বিশেষ করে বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হামলার কথা বলা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।
ট্রাম্পবাদের বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ
ট্রাম্পের এই অবস্থান ‘ট্রাম্পবাদ’ (Trumpism) নামক এক প্রভাবশালী চিন্তাধারারই প্রতিফলন। সানফোর্ড শ্রাম তার ‘দ্য ট্রাজেক্টরি অব ট্রাম্পিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ট্রাম্পবাদ একটি সুসংহত বক্তৃতার সমাহার যা ভীতি প্রদর্শন, ‘শত্রু’ চিহ্নিতকরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করাকে কৌশল হিসেবে নেয়। যেখানে খাতামির সভ্যতাগত সংলাপ ছিল উন্মুক্ততা ও শোনার, সেখানে ট্রাম্পবাদের ভাষা হচ্ছে 'হয় আমাদের সাথে থাকো, নয় তো তুমি আমাদের বিপক্ষে'। এই বাচন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে দুর্বল করবে এবং ‘স্টোকাস্টিক সন্ত্রাসবাদ’-কে উসকে দেবে।
ট্রাম্পের এই হুমকি ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির পাশাপাশি আঞ্চলিক অস্থিরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফ্রাঙ্ক গার্ডনার প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প কি ইরানের পার্সেপোলিসের মতো প্রাচীন নিদর্শন ধ্বংসকারী হিসেবে ইতিহাসে নাম লিখিয়ে দিতে চান?
হুমকি যতই ভয়ঙ্কর হোক না কেন, ইরানের মত একটি প্রাচীন সভ্যতার আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক চেতনা সহজে নিশ্চিহ্ন করার মতো নয়।
ইতিহাস সাক্ষী যে পারস্য সভ্যতা বহুবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। আলেকজান্ডার পুড়িয়েছেন পার্সেপোলিস। কিন্তু এত ধ্বংসের পরও এই সভ্যতা পুনর্জন্ম লাভ করেছে—ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য, শিল্প ও কৃষ্টি আজও অম্লান। ট্রাম্পের বোমা যদি ঐতিহাসিক ইসফাহানের মসজিদ ধ্বংস করে, তবে তা ধ্বংস করবে পাথরের গাঁথুনি, কিন্তু ধ্বংস করতে পারবে না একটি জাতির আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির চেতনা।
আজকের এই সংকটময় মুহূর্তে খাতামির ‘সভ্যতাগত সংলাপ’-এর প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। ট্রাম্পের ধ্বংসের ভাষার জবাব দেওয়া উচিত সংলাপ ও মানবিক মূল্যবোধের ভাষায়। ট্রাম্পের এই হুমকি গণবিধ্বংসী অস্ত্রের যুগে যুদ্ধাপরাধের সুস্পষ্ট উদাহরণ। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর একমাত্র পথ হলো আন্তর্জাতিক আইনের শক্ত ভিত্তি ও সভ্যতাগত সংলাপের পথে ফিরে আসা। ট্রাম্পবাদের হিংস্র বক্তৃতা যতই ভয়ঙ্কর হোক না কেন, ইরানের প্রাচীন সভ্যতা ও খাতামির সংলাপের চেতনা—এই দুই মিলেই ভবিষ্যতের শান্তির পথ রচিত হবে।
গ্রন্থপঞ্জি
১. শ্রাম, সানফোর্ড এফ. (২০২৬)। দ্য ট্রাজেক্টরি অফ ট্রাম্পিজম: টকিং অ্যাবাউট রেসিজম, ফ্যাসিজম, সিভিল ওয়ার, অ্যান্ড বিয়ন্ড। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
২. হলিডে, শাবনাম ও ওয়াস্টনিজ, এডওয়ার্ড (২০২৫)। “টুওয়ার্ডস আ পোস্ট-ইম্পেরিয়াল অ্যান্ড গ্লোবাল আইআর?: রিভিজিটিং খাতামিজ ডায়ালগ অ্যামং সিভিলাইজেশনস”। রিভিউ অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, ৫১(১), পৃ. ১৫৯-১৭৮।
৩. ডালমায়ার, ফ্রেড ও মনুচেহরি, আব্বাস (সম্পা.) (২০০৭)। সিভিলাইজেশনাল ডায়ালগ অ্যান্ড পলিটিক্যাল থট: তেহরান পেপার্স। লেক্সিংটন বুকস।
৪. আহমেদ, আকবর ও ফরস্ট, ব্রায়ান (সম্পা.) (২০০৫)। আফটার টেরর: প্রমোটিং ডায়ালগ অ্যামং সিভিলাইজেশনস। পলিটি প্রেস।
৫. খাতামি, সৈয়দ মোহাম্মদ (১৯৯৮)। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ, ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৮।
লিখেছেন :