About Us | Contact Us |

মারছে চার মারছে ছয় : অকুতোভয়

মারছে চার মারছে ছয় : অকুতোভয়

গলির মোড়ে একটা গাছ দাঁড়িয়ে

গাছ না গাছের প্রেতচ্ছায়া —

আঁকাবাঁকা শুকনো কতকগুলি কাঠির কঙ্কাল

শূন্যের দিকে এলোমেলো তুলে দেওয়া,

রুক্ষ রুষ্ট রিক্ত জীর্ণ

লতা নেই পাতা নেই ছায়া নেই ছাল-বাকল নেই

নেই কোথাও এক আঁচড় সবুজের প্রতিশ্রুতি

এক বিন্দু সরসের সম্ভাবনা ।

 

সম্পূর্ণ অচেনা বিচিত্র এক সমাজকে প্রত্যক্ষ করে কবি অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত লিখেছিলেন এই কবিতা। এখানে সান্ত্বনা পাওয়ার মত মায়ের আঁচলের ছায়া কোথাও নেই । পাখির নীড়ের মতো আশ্রয় ও ভরসা জাগানো বনলতা সেনের চোখ নেই। সকলেই বুঝি আঁড় চোখে চায়। মাঝে মাঝেই খবর আসে ঘরে গোমাংস থাকার সন্দেহে গণপ্রহারের। খবর শুনতে পাই বাংলাভাষী হওয়ার অপরাধে বাংলা কথা বলার অপরাধে প্রহার, নির্যাতন, মৃত্যু, বলপূর্বক বাংলাদেশে পাঠান।

 

অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল খেলার মাঠে সাপ ছেড়ে দিয়ে পাক ক্রিকেটারদের ফিল্ডিংয়ে ব্যাঘাত সৃষ্টি করার ঘটনা। আর এখন তো পাকাপাকিভাবে এদেশে পাক ক্রিকেটারদের আগমন বন্ধ হয়ে গেছে। বিদেশের মাটিতে সাক্ষাৎ হলেও করমর্দন কদাচ নয়। এমনকি বাণিজ্যিক ক্রিকেট আইপিএলেও পাক ক্রিকেটার ব্রাত্য। গোলাম আলী, মেহেদী হাসান এদেশে আর গান গাইতে আসবেন না। পাক চিত্র তারকারা বলিউডের সিনেমায় আর অভিনয় করবেন না। এমনকি এদেশের মাটিতে একটু এদিক-ওদিক বেসুরো কথা হলে একটাই জবাব, "পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবো"। ভোট হবে বিহারে, দিল্লিতে, বা ঝাড়খণ্ডে। কিন্তু বক্তৃতায় বলা হবে, এমন ভাবে ইভিএম এর বোতাম টিপুন যাতে লাহোর করাচিতে ঝটকা লাগে। এক সর্বাত্মক ঘৃণার চাষ। 

 

 

 

গো মাংস দিয়ে শুরু হলেও, এখন তা বিস্তার লাভ করে যে কোন মাংস মাছ সকলকে গ্রাস করছে। অ্যানিমেল প্রোটিন কার্যত নিষিদ্ধ হয়েছে, দিল্লিতে দুর্গাপুজোয়, হাটে বাজারে, বিহারে, উড়িষ্যায়, মধ্যপ্রদেশে, রাজস্থানে। হিন্দু মুসলমান আখ্যানটি প্রসারিত হয়েছে আমিষ নিরামিষে, হিন্দি ও হিন্দিতে, খাদ্যাভ্যাস পোশাক ভাষা সবই আক্রান্ত।গ্যাটিংগেনে পড়তে এসে আমার ছাত্রের এমনই নিকট বন্ধু, পাকিস্তানি মোস্তাক আফ্রিদি। সে বলতো তোমরা ভারতীয়রা ভাবো পাকিস্তানিদের কোন কাজ নেই। তারা ঘুমোয় না, খায় না, প্রেম করে না, আহ্লাদ করে না, পড়াশুনা গান কবিতার বালাই নেই, শিশু কিশোর দাদি, সবাই সারাক্ষণ বন্দুক তাক করে আছে ভারতের দিকে। আর তাদের যত মাথাব্যথা কাশ্মীর নিয়ে। উল্টো দিকে পাকিস্তানের লোকেও এমনটাই ভাবে, ভারত সদাই পাক সীমান্তে সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে। এই বুঝি জঙ্গি হামলা হলো। 

 

ইতিহাসেরও আগে সেই কবে থেকে এক নাড়ির সম্পর্কে বাঁধা, একই আত্মায় জন্ম নেওয়া, সিন্ধু সভ্যতার এক ধারাবাহিক বন্ধন। মেহেরগড় থেকে মহেঞ্জোদারো, সেই বন্ধন বিদেশি শাসক ও এদেশের কিছু স্বার্থান্বেষীর ইচ্ছায় মানচিত্রের ওপর কালির দাগ টেনে দিল। অপর সৃষ্টি করল। কিন্তু নদীর জল, সে তো সীমানা মানে না। ভেড়া চড়াতে আসা মেষপালক সেও সীমানা মানে না। বাড়ির পোষা কুকুরটা সীমানা মানেনি, আর তারই পেছনে তাকে খুঁজতে আসা শিশুও সীমানা জানেনা। ফলে অনুপ্রবেশকারী হয়ে আটকে পড়ে এদেশের কারাগারে। রামচন্দ্র পাকিস্তানী চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। আঁকাবাঁকা শুকনো কতকগুলি কাঠির কঙ্কাল, শূন্যের দিকে এলোমেলো তুলে দেওয়া, রুক্ষ রুষ্ট রিক্ত জীর্ণ শুধুই আইন কাঁটাতার পাসপোর্ট ভিসা অনুপ্রবেশ পাহারা ইত্যাদি নানাবিধ শব্দের কঙ্কালে আবদ্ধ মানব পরিচয়। 

 

হঠাৎই বুঝি এই ২০২৬ এর সূচনায় এক ঝলক বাতাস জানিয়ে গেলো বসন্ত এসে গেছে। প্রায় ১৪ জন প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক পাকিস্তান সরকারকে 'প্রাক্তন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধিনায়কদের আবেদন' শিরোনামে একটি চিঠি লিখেছেন। সুনীল গাভাসকর, কপিল দেব ছাড়াও গ্রেগ চ্যাপেল, মাইক আর্থারটন, অ্যালান বর্ডার, মাইকেল ব্রিয়ারলি, ইয়ান চ্যাপেল, বেলিন্দা ক্লার্ক, ডেভিড গাওয়ার, কিম হিউজেস, নাসের হুসেন, ক্লাইভ লয়েড, স্টিভ ওয়া, জন রাইটের মতো কিংবদন্তিরা এই আবেদনপত্র লিখেছেন। চিঠিতে প্রাক্তন অধিনায়কেরা লিখেছেন, 'সহকর্মী ক্রিকেটার হিসেবে আমরা জানি, ন্যায্যতা, সম্মান ও মর্যাদা এই মূল্যবোধগুলি খেলার মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। ইমরান খানের মতো ব্যক্তিত্ব, যিনি একজন প্রাক্তন জাতীয় নেতা এবং বিশ্ব ক্রীড়া আইকন, তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা উচিত।' সুনীল গাভাস্কার এবং কপিল দেবের কথা উল্লেখ করে প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল বলেন, "প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কিত বিষয়ে তাদের দেশে যে উল্লেখযোগ্য চাপের সম্মুখীন হতে হয়, তা সত্ত্বেও তারা এই মানবিক উদ্যোগে যোগ দিয়েছেন।"

 

এর পরেই প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রী এবং প্রাক্তন ক্রিকেটার ইমরান খানের হয়ে মুখ খুললেন ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক বাংলার কৃতি সন্তান সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ইমরান খানকে আন্তর্জাতিক মানের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সুনীল গাভসকর, কপিল দেব সহ বহু কিংবদন্তি পাকিস্তান সরকারকে চিঠি লিখেছিলেন। সেই পদক্ষেপ একদমই সঠিক বলে মন্তব্য করেছেন সৌরভ। সৌরভ বলেন, ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা ইমরান খান অধিনায়ক ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

 

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, 'প্রাক্তন অধিনায়কদের (সুনীল, কপিলদের) আবেদন সঠিক পদক্ষেপ। আমি আশা করি ইমরানের স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে এবং তিনি যথাযথ চিকিৎসা পাবেন। তিনি প্রথমে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাই তাঁর যত্ন নেওয়া উচিত। আমি আশা করি সেটাই ঘটবে।' বাপি বাড়ি যা শট্ এবার দেশের সীমান্ত ছাড়াল। 

 

উল্লেখ্য, বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ১৯৯২ বিশ্বকাপ বিজয়ী দলের অধিনায়ক ইমরান খান রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এর জেরে তিনি ডান চোখের প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৩ সালের অগস্ট থেকে ইমরান খান ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবি জেলবন্দি।

সবাই মিলে সোচ্চারে কইছে কথা

তখন ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গলা, 

কথা বলা, কঠিন নয়। 

কিন্তু যখন শুনশান নিস্তব্ধ পাড়া

নিজের কথা ফেরে নিজের কানে, 

হায়নার চোখ টহলদার -- 

তখন যে জন চলে একলা, বলে একলা, 

সে জন হিম্মতওয়ালা।  

 

মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে, গ্যালারি তে বল কতই তো ফেলে। স্টেডিয়ামের বাইরেও ফেলে চার এবং ছয়। এবার বল ছূটছে দেশ মহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে, তোমরাই প্রকৃত অধিনায়ক, তোমরা অকুতোভয়। এবার বুঝি আশায় বাঁচে চাষা। ফাৎনায় পড়ে টান। 

 

ফিরে আসতেই দেখি

গলির মোড়ে গাছের সেই 

শুকনো বৈরাগ্য বিদীর্ণ করে

বেরিয়ে পড়েছে হাজার হাজার সোনালি কচি পাতা

মর্মরিত হচ্ছে বাতাসে,

দেখতে দেখতে গুচ্ছে-গুচ্ছে উথলে উঠছে ফুল

ঢেলে দিয়েছে বুকের সুগন্ধ,

উড়ে এসেছে রঙ বেরঙের পাখি

শুরু করেছে কলকন্ঠের কাকলি,

ধীরে ধীরে ঘন পত্রপুঞ্জে ফেলেছে স্নেহার্দ দীর্ঘছায়া

যেন কোন শ্যামল আত্মীয়তা ।

অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে দেখলুম

কঠোরের প্রচ্ছন্নে মাধুর্যের বিস্তীর্ণ আয়োজন।

 

ক্লান্তি কেটে যায়, এক নতুন আশা উদ্দীপনা সঞ্চারিত হয়। হৃদয়ের পথ ধরে হেঁটে চলি আমি। খুঁজে ফিরি আমি হৃদয় পুরি। জীবন আনন্দ খুঁজি, জীবনের পথে পথে। ঘুরে ফিরে আসি বারবার। দেশ কাল সীমা ছাড়ায়ে যে প্রাণ, স্বপ্নের নীল ডানায় ভাসে -- আমি খুঁজি তারে ভালো বাসিবারে।

নন্দন কুমার বসু
নন্দন কুমার বসু

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক