মুর্শিদাবাদ রেল স্টেশনের পশ্চিম দিকে সংলগ্ন এলাকার নাম সুকান্তপল্লী। এখানে ২০০০ সালে তৈরি হয়েছিল প্রবাহ ক্লাব। পাশেই ৪৭নং দাগে (মৌজা গোলাপবাগ) ১.৩০ একর জমির সরকারি নথিতে লেখা আছে মসজিদ রয়েছে। গত বছর ১৫ আগস্ট জাতীয় পতাকা তোলা অনুষ্ঠান করতে গিয়ে মুর্শিদাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রের ভারতীয় জনতা দলের বিজয়ী প্রার্থী গৌরী শঙ্কর ঘোষ ক্লাবের ছেলেদের নির্দেশ দেন ৪৬ নং দাগের জমিতে গিয়ে পতাকা তুলতে। তাঁর অভিপ্রায় দুটি হতে পারে: ১) মুসলমানরা জাতীয় পতাকাকে মানে না প্রমাণ করা, ২) উল্লিখিত জমিটি ক্লাবের নিজস্ব ব্যবহারে, নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। বিধায়কের সাথে যোগাযোগ হয়নি। তাঁর মত বা প্রতিক্রিয়া এই বিষয়ে জানা যায়নি। এবারের নির্বাচনে তিনি অনেক বেশি ব্যবধানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল কংগ্রেসের শাওনি সিংহ রায়কে হারিয়েছেন। সাফল্য আসেনি।
পাশের ৪৮ নং দাগের (মৌজা গোলাপবাগ) জমিতে বাগানে মসজিদ আছে বলে লেখা আছে সরকারি খতিয়ানে। এই দাগের জমির পরিমাণ ১.৪২ একর। ৪৭ ও ৪৮ নং দাগ দুটির সাবেক দাগ নং ছিল (সিএস খতিয়ানে) ৩১ ও ৩২, মোট ২.৭২ একর। তিন দিক ঘেরা। দুটি দাগেরই জমি ওয়াকফ সম্পত্তি (ধর্মীয় বা পবিত্র বা জনহিতকর কাজে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ) হিসাবে ০৭-০২-২০১৯ তারিখে পঃবঙ্গ ওয়াকফ বোর্ডে নথিবদ্ধ (এনরোলমেন্ট সার্টিফিকেট বা নথিবদ্ধ শংসাপত্র নং ১৫৬৮৪)। ফজলে খোদা নবাব সুজাউদ্দিন খান জুম্মা মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই সম্পত্তি। সংশ্লিষ্ট সব বিভাগে ১৮-০৭-২০১৯ তারিখে জানানো হয়েছিল (মেমো নং ১৭৪৫)। কোন মহল বা পক্ষ থেকে কোন আপত্তি ওঠেনি। প্রবাহ ক্লাব এই সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি তথা সরকারি খাস হিসাবে দাবি করে ২০২২ তারিখে ওয়াকফ ট্রাইবুনালে মামলা করলে ট্রাইবুনাল ক্লাবের দাবি খারিজ করে দেয় ০২-০৯-২০২৫ তারিখে এবং স্টাটাস কুয়ো (যেমন আছে তেমন) বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। ৪৭নং জমিতে দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শিশু, কিশোররা খেলা করত, মসজিদে বেশি ভিড় হলে গাড়ি রাখার জন্য ব্যবহৃত হত। ২০২২ সালে ক্লাব হঠাৎই ওই মাঠে চড়ক মেলার আয়োজন করে। মসজিদ কমিটি আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত বাধা দেয় না কারণ প্রস্তুতি অনেক এগিয়েছে। সেই সময় ক্লাবের পক্ষে ৪৭ ও ৪৮ নং দাগের সীমানা ঘেঁষে ইট, সিমেন্ট দিয়ে একটা বেদি বানালে কমিটি আপত্তি তোলে। তবে কোন অশান্তি সৃষ্টি করেনি। ২০২৩ সালে ক্লাব নভেম্বর মাসে কালি পুজো করার উদ্যোগ নিলে কমিটি মুর্শিদাবাদ থানায় জানায় সংঘর্ষ হতে পারে আশঙ্কায়। থানা অনুমতি দেয় ক্লাবের পক্ষে বিশ্বজিৎ রায়, তারক মাল, শুভজিৎ ঘোষ, রজত তেলি, সমীর মণ্ডল ও সুজন হাড়ির কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে যে ওই দুটি দাগের সম্পত্তি যে সরকারের খাস সম্পত্তি এই মর্মে আইনী কাগজ দেখাতে না পারলে সেই জমি তারা আর ব্যবহার করার চেষ্টা করবে না। তবু ২০২৫ সালে বিধায়কের মৌখিক নির্দেশে ক্লবের ছেলেরা মাঠে ঢুকে জাতীয় পতাকা তোলে ১৫-০৮-২০২৫ তারিখে। থানা খবর পেয়ে এসে জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে পুরো জমি করগেট টিন আর লোহার খুঁটি দিয়ে ঘিরে দেয়। কিন্তু গত ৫ মে (২০২৬) দুপুর সাড়ে এগারোটা নাগাদ ক্লাবের নেতৃত্বে একদল নারী, পুরুষ এসে লাঠি দিয়ে টিনের বেড়া ভেঙে ওই মাঠে প্রবেশ করে যদিও ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর এবং ২০২৫ সালের ০২ সেপ্টেম্বর ওয়াকফ ট্রাইবুনাল ওই জমিতে যথাযথ অনুমতি ব্যতিরেকে কারও প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এখন বিতর্কিত জমিটুকু কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রহরায় আছে। কোন পক্ষই মাঠে প্রবেশ করছে না। তবে আশঙ্কা রয়ে গিয়েছে যে ক্লাব ফের আইন অমান্য করে ওই জমিতে ঢুকবে, স্থায়ী ভাবে দখল নেবে। মসজিদ কমিটির মুতাওল্লি (ওয়াকফ বোর্ড কর্তৃক নিয়োজিত রক্ষণাবেক্ষণকারী) কবিরুল ইসলাম জানালেন, তাঁরা আইনের উপরেই ভরসা রাখছেন। সংঘর্ষ শুরু হলে তাঁদের দিক থেকে পুলিশের উপর ভরসা করা ছাড়া অন্য পথ নাই।
ঋণ: বীক্ষণ