ইতিহাসের ভাষা অনেক সময় তিক্ত। কিন্তু সেই তিক্ততাই সত্যের জন্ম দেয়। আধুনিক বাংলার সমাজ-রাজনীতি, জন demography, জাতিভিত্তিক ক্ষমতাবিন্যাস—সব কিছুর শিকড় আছে ১৯০৫ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে। আজ যখন “SIR”, “বাস্তুচ্যুতি”, “সাংস্কৃতিক হুমকি” ইত্যাদি শব্দে জনচেতনা উত্তপ্ত, তখন এই আখ্যানকে নতুনভাবে দেখা জরুরি।
১. বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা ও বঙ্গভাগের সমর্থন—সামাজিক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় বাঙালি হিন্দু ভদ্রসমাজ পথে নেমেছিল—“বঙ্গভঙ্গ রদ করো” শ্লোগানে। কিন্তু ১৯৪৭ এ বাংলা ভাগের দাবি সেই ভদ্রসমাজের বড় অংশই তুলেছিল। এর কারণ শুধু দেশপ্রেম বা ভাষাপ্রীতি ছিল না; ছিল বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ। দক্ষিণ বাংলার অনেক ধনী বণিক-জমিদার বর্গী আক্রমণের পর পূর্ববঙ্গে বিস্তৃত জমিদারি করেছিলেন। ব্রিটিশের অপ্রস্তুত বঙ্গভঙ্গে সেই সম্পদ বিপন্ন হয়ে পড়েছিল—তাই তাদের প্রতিরোধ। কিন্তু ১৯২০-এর দশকে পরিস্থিতি বদলাল। যুক্তবঙ্গের রাজনৈতিক গণিত বদলে যাচ্ছিল। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে হিন্দু জমিদার শ্রেণী বুঝে গেল ক্ষমতার পাল্লা ঢলে যাবে। তাই জমি বিক্রি করলেন, বদলি করলেন, তারপর ধীরে ধীরে পশ্চিমদিকে চলে এলেন। অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা ছিল জমিদারি রক্ষার আন্দোলন, আর বঙ্গভাগের দাবি ছিল সেই জমিদারি সুরক্ষার পরবর্তী ধাপ।
এদিকে কলকাতার পুরনো “ঘটি” অভিজাত সমাজ প্রথমদিকে এই নবাগতের প্রতি নির্লিপ্ত ছিল। ফলে কলকাতা ময়দানে ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব ও “উয়ারি” নামের ক্লাব গড়ে উঠল—সামাজিক পরিচয় ও শ্রেণী রাজনীতির সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে।
২. মুসলমান জনসংখ্যা নিয়ে আতঙ্কের জন্ম
বাংলার মুসলমান জনসংখ্যা ১৯৪৭-এ পূর্ববঙ্গে চলে যাবে—এই কল্পনায় অনেকেই নির্ভার ছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বৃহৎ অংশের বাংলার মুসলমান রয়ে গেলেন এই বাংলায়। উত্তর-পূর্ব ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তার তাগিদে মুর্শিদাবাদ, মালদহের মত বহু মুসলিম অধ্যুষিত জেলা ভারতীয় বাংলায় রাখা হলো। অর্থাৎ “নিরাপদ হিন্দু বাংলা”র কল্পনা ভেঙে পড়ল। সেখানেই বীজ পড়ল দীর্ঘ রাজনৈতিক আতঙ্কের—যার ফল আমরা আজও দেখি।
৩. অবর্ণ বাঙালির দীর্ঘ পথ—করুণ কিন্তু সংগ্রামী
এ এক নির্মম সত্য, যে দেশভাগের সময় সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চবর্ণ ও উচ্চবিত্ত হিন্দুরা প্রধানত নিরাপদে এপারে এলেন। কিন্তু নিম্নবর্ণ হিন্দুরা—বিশেষত নমঃশূদ্র ও শূদ্র কৃষিজীবি বাঙালিরা—মাটি আঁকড়ে ছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন দেশ তাদের ঠকাবে না। কিন্তু ১৯৬৫-র যুদ্ধ, শত্রু সম্পদ আইন, রাজাকারদের অত্যাচার তাঁদের সেই মাটি থেকে উপড়ে দিল। লক্ষ লক্ষ দরিদ্র বাঙালি পরিবার—হাতে শুধু শ্রম, পেটে ক্ষুধা, চোখে বেঁচে থাকার জেদ—ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে গেলেন। দণ্ডকারণ্য, আন্দামান, মালকানগিরি, আসাম-ত্রিপুরা-মেঘালয়া—যেখানে স্থান মিলেছে সেখানেই নতুন জীবন গড়েছেন।
বাংলা তখনো তাদের জন্য ছিল না। মরিচঝাঁপি সেই নিষ্ঠুর প্রমাণ—যেখানে রাষ্ট্রের চোখে উদ্বাস্তু অবর্ণ বাঙালি ছিল ‘সমস্যা’, মানবিক সত্তা নয়। নদীর জল, জঙ্গলের বাঘ-সাপ-কুমির শুধু নয়—বদ্ধমূল বর্ণবৈষম্যও ছিল তাদের প্রতিপক্ষ।
৪. রাজনীতি ও জাতি—পি.আর. ঠাকুরের আগমন ও পরিণতি
অবর্ণ উদ্বাস্তুদের রাজনৈতিক প্রভাব যাতে বামপন্থা বা মুসলিম নেতৃত্বের দিকে না যায়—কংগ্রেস সেই হিসেবেই পি.আর. ঠাকুরকে ভারত আনার পথ তৈরি করেছিল বলে ইতিহাস বলে। এতে কংগ্রেস লাভ দেখেছিল—একদিকে নমঃশূদ্রের এক বড় নেতা পেল, অন্যদিকে বাংলায় হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধি হলো। সেই রাজনীতি আজ ভিন্ন রূপ নিয়েছে—ঠাকুর পরিবার বিজেপির ভোটব্যাঙ্কের প্রধান স্তম্ভ।
অর্থাৎ দল বদলেছে, ক্ষমতা বদলেছে, কিন্তু নিম্নবর্ণ উদ্বাস্তুকে ভোটের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস বদলায়নি।
৫. SIR বিতর্কে কার উল্লাস, কার শঙ্কা?
আজকের SIR (Special Intensive Revision) বিতর্ক অনেককে উল্লসিত করে। কিন্তু ইতিহাস বলছে—যে শ্রেণী গত শতাব্দীজুড়ে রাষ্ট্র ও সমাজে সুরক্ষিত ছিল, তারাই বেশি নিশ্চিন্ত। আর যারা রাষ্ট্রহীনতার দংশন ভোগ করেছে—যারা বাঘ-সাপ-সীমানা-সামরিকতা—সবকিছুর সঙ্গে লড়ে বেঁচে আছে—তাদের আতঙ্কই স্বাভাবিক।
শুধু মুসলিম নয়—অসংখ্য অবর্ণ হিন্দু বাঙালিও জানে—নাগরিকতার প্রশ্ন এই ভূখণ্ডে কখনোই কেবল কাগজের নয়, ছিল ক্ষমতার; ছিল বর্ণের; ছিল ভূমির অধিকার ও ভাষার দখল নিয়ে রণক্ষেত্র।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলার ইতিহাস কেবল “হিন্দু-মুসলমান” বিভেদ নয়—এ ইতিহাসে আছে হিন্দু-হিন্দু বৈষম্য, শ্রেণী-সংকট, জমিদারি ও পুঁজির নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের নৃশংসতা, এবং সবচেয়ে বেশি—অবর্ণ-দলিত-দরিদ্র উদ্বাস্তু বাঙালির বেঁচে থাকার অবিশ্বাস্য লড়াই।
আজ যারা ক্ষমতার উল্লাসে ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায় ভুলে যেতে চান—তারা ভুলছেন, অপ্রিয় সত্য চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না। এই মাটিতে যে শ্রমিক, কৃষক, নমঃশূদ্র, মুসলমান, তফসিলি, উদ্বাস্তু—তাদের ঘাম ও অশ্রু মিশে আছে—তাদের বাদ দিয়ে “বাংলা”, “জাতি”, “ধর্ম”, “নাগরিক”, কোনো পরিচয়ই পূর্ণ হয় না।
ইতিহাস বধির নয়—সে পুনরাবৃত্ত হয়। তাই প্রিয় হোক বা অপ্রিয়—সত্য উচ্চারণই শুদ্ধির প্রথম ধাপ।
লিখেছেন :