ভারতবর্ষের ইতিহাসে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তাত্ত্বিক কাঠামোর প্রধান ভিত্তিই হল ব্রাম্মণ্য ভাবধারা৷এই ধারা মার্কস ,লেনিন,এঙ্গেলস কেউ আলোচনা করেননি ৷জ্যোতিবা ও সাবিত্রীবাই ফুলে এবং বাংলার হরিচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে পরিচালিত জাত-বিরোধী সংগ্রামের কথা, বিশ শতকের জাত-বিরোধী আন্দোলনের লড়াকু নেতৃত্ব বি. আর. আম্বেদকর ও ই. ভি. রামাসামি পেরিয়ার
এবং 'দ্য শূদ্র বিদ্রোহ' বইয়ের লেখক কাঞ্চা ইলাইয়া ৷ এছাড়া ব্রাম্মণ হয়েও ব্রাম্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায়—প্রমুখদের মধ্যেও জাতিবৈষম্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদবিরোধী বহুজনের আদর্শ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল৷ তিনি বাংলার আম্বেদকর নামে পরিচিত৷উপনিবেশ মুক্তির সংগ্ৰামে শেষলগ্নে ভারতবর্ষে হিন্দু জাতীয়তা এবং মুসলমান জাতীয়তা উচ্চবরগীয় পরিমন্ডলের বাইরে তৃতীয় স্বতন্ত্র ধারাও ছিল ৷ সেই ধারার নেতৃত্বে দিচ্ছিলেন পশ্চিম উত্তর ভারতে আম্বেদকর ,দক্ষিণ ভারতে পেরিয়ার এবং বাংলায় প্রথম পর্যায়ে গুরুচাঁদ ঠাকুর ও পরবর্তীকালে যোগেন মন্ডল৷ঔপনিবেশিক ভারতের বাংলায়" বহুজনবাদী" আদর্শের অঙ্কুরোদ্গম হয় যোগেন মন্ডলের হাত ধরে।ঔপনিবেশিক বাংলায় ব্রাম্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড়ায় যোগেন মন্ডলের " বহুজনবাদ'৷"বহুজনবাদ " হল একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারণা, যা ভারতীয় সমাজে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ এবং অন্যান্য সামাজিক বৈষম্যের শিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।আর "ব্রাম্মণ্যবাদ'মূলত কোন অর্থনৈতিক বা সামাজিক ব্যবস্থা নয় ,এটি একটি শোষণ ও শাসনপদ্ধতি৷ এই শাসনপদ্ধতির জন্য বাংলা ভাগ হয়েছিল৷ব্রাম্মণ্যবাদ বর্ণপ্রথার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে৷কিন্তু ব্রাম্মণ্যবাদ শ্রেনী বিভাজন ছাড়াও সৃষ্টি করে ধর্ম ,বর্ণ ও জাতি বিভাজন৷এই বিভাজন তৈরি হয় পরধর্ম বিদ্বেষ ,বর্ণ বিদ্বেষ ও জাতি বিদ্বেষ থেকে৷ ভারতীয় সমাজে শ্রেনীবিভাগের প্রকাশ ঘটেছে জাতি ভেদের রূপে৷ আর শ্রেণী শক্রর প্রকাশ ঘটেছে সামন্তবাদের বদলে ব্রাম্মণ্যবাদ রূপে৷ব্রাম্মণ্য আধিপত্যের (ব্রাম্মণ্যবাদ)ধর্মীয় অনুমোদন রয়েছে৷ গণতন্ত্র ও বর্ণপ্রথা এক সাথে থাকতে পারে না৷তাই ব্রাম্মণ্যবাদ থেকে কমিউনিস্ট দলগুলিও রেহাই পায়নি ৷ভারতবর্ষে মার্কসের চিন্তায় আজকে শোষক শ্রেণী বলতে শোষক বর্ণবাদী ও ব্রাম্মণ্যবাদী৷এদেশে জাতীয়তাবাদকে জন্মই দেওয়া হয়েছিল ব্রাম্মণ্য ঐতিহ্যের ভক্তি ও তৎসৎশ্লিষ্ট বলিদানের ধারাকে সুচতুর ভাবে ব্যবহার করে৷ দেখা যাচ্ছে আম্বেদকর ও যোগেন মন্ডল তাঁদের শূদ্রতার কারণে কোনো জাতীয়তাবাদেই গৃহীত হন নি।আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে কোন বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী বিপ্লবই সংগঠিত হয় নি ,যেমন হয়েছিল ইউরোপের রেনেসাঁসের যুগে৷কারন আমাদের দেশে বিজ্ঞান ও কুসংস্কার একই মনে সহাবস্থান করে ৷এখনো কার্যত শাসক এলিটরা তাদের শাসনান্ত্র হিসেবে ব্রাম্মণ্যবাদ কে বহাল রাখতে চাইছে৷বর্তমান ভারতে দৃশ্যমান সংখ্যালঘু মুসলিম , খ্রিস্টান ও দলিত ,সাঁওতাল বিদ্বেষের কারন নিহিত আছে ব্রাহ্মণ্যবাদী কালচারাল হেজিমনির মধ্যে৷আজকের একুশ শতকের ভারতীয় রাষ্ট্র ও সমাজে পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্রাম্মণ্যবাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রবল৷সেই জন্য আজও যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের " বহুজনবাদী ' রাজনীতি প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে যায় নি৷ যে রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তাকে এই আলোচনায় উপমহাদেশের প্রথম " বহুজনবাদী " রাজনীতি হিসেবে তুলে ধরার প্রয়াস ৷যে রাজনীতিকে যোগেন মন্ডল বলতেন " মনুবাদ" বিরোধিতা৷ অর্থাৎ জাতিঘৃণা ও সামাজিক বিভেদবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো৷ যেসব ধর্মীয় প্রথা শোষণের পাটাতন হিসেবে কাজ করে ,তার বিরোধিতায় আন্তধর্মীয় মৈত্রীর ডাক দিয়েছিলেন যোগেন মন্ডল৷যোগেন মন্ডলের এরূপ রাজনৈতিক সফলতা ছিল "ছোটলোক"পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে মহিমান্বিত করার মধ্যে দিয়ে৷তিনি রাজনীতি বাংলার প্রথাগত জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কোনো ধারা হিসেবে নয় ,নতুন এক চেতনা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন৷বস্তুত ১৯০০ এর পর থেকে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের কৌশল হিসেবে মুসলমান সম্প্রদায় যেমন পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য লড়ছিল ,নিন্মবর্ণের হিন্দুরাও ক্রমে ক্রমে একই দাবির দিকে ধাবিত হচ্ছিল৷ নিজ জাতির প্রতিনিধিত্ব তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক পরিসরে খুঁজে পাননি যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল। তাই তিনি ‘নিপীড়িত শ্রেণির হিস্যা’কে সম্বল করেই তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন৷দাবি ছিল নিপীড়িত দলিত শ্রেণির জন্য পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা৷তিনি মনে করতেন আর্থসামাজিক দিক দিয়ে ও নৃতাত্ত্বিকভাবে বাংলার কৃষিজীবী খেটে খাওয়া মুসলমান আর কৃষিজীবী নমঃশূদ্র একই স্তরে অবস্থান করে। প্রায়শই তাঁকে বলতে শোনা যেত, “জমির আল যার সাথে আন্দোলন তার সাথে”।তিনি বুঝতে পেরে ছিলেন যে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে নমশূদ্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের মিল রয়েছে৷ বাংলায় শ্রেনীভেদ -জাতিভেদ -অর্থনৈতিক ভেদ এভাবেই এক সরল রেখায় এসেছিল তখন৷তিনি মনে করতেন হিন্দুু-মুসলমানের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐক্য উচ্চবর্ণের বানানো একটি কাঠামো৷বিজেপি -আর এস এস পরিবার একটি বিষয়কে খুবই ভয় পাচ্ছে এবং আড়াল করতে চাইছে তা হলো " দলিত -মুসলিম ঐক্য "৷বস্তুত ভারতে তথা বাংলায় এখন যে দলিত মুসলিম ঐক্যের ভিত্তি করে নির্মবরগের শক্তি বৃদ্ধির যে আয়োজন চলছে ,তা প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৭ পূর্ব যোগেন মন্ডলরেই রাজনৈতিক বিশ্বাস ও তত্ত্ব৷এই বিশ্বাসে তিনি ব্রাম্মণ্যবাদী সাম্রাজ্যবাদের উঁচু মিনার ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন৷ শূদ্র ও অতি শূদ্রের নিজস্ব একটি মৌলিক ধর্মীয় ,অর্থনৈতিক ,রাজনৈতিক ,সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দর্শন রয়েছে ,যা হিন্দু দর্শন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা৷ তা হিন্দু ধর্ম ও হিন্দুত্বের দেহে মিশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই৷ দলিত বহুজন পৌরাণিক কাহিনী এবং কিংবদন্তি কখনও পাঠ্য পুস্তকে কোনও উল্লেখ পাওয়া যায় না৷পাঠ্যপুস্তকে মূলত ব্রাম্মণ্যবাদী চেতনার সাথে সম্পর্কিত৷
হিন্দু ধর্মগ্ৰন্থ গুলিতে যে ধরনের বর্ণ ভিত্তিক বৈষম্য প্রচার করা হয়েছে তা সচেতনভাবে নিন্ম শূদ্র বর্ণগুলিকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং ব্রাম্মণ অভিজাতদের হাতে সামাজিক ,অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা জমা করে ৷ এই শোষণমূলক চরিত্রের বিরুদ্ধে দলিত বহুজনরা যাতে সংগঠিত না হয় ,এবং সামাজিক ,রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমতা দাবি করার জন্য সমানভাবে জেগে না ওঠে৷ তার জন্য ঠিক এই লক্ষ্যেই ১৯২০-৩০ এর দশকে তফশিলিদের হিন্দুকরণের রাজনীতি শুরু হয়।পঞ্চানন বর্মার নেতৃত্বে "ক্ষত্রিয় আন্দোলন"
স্বতন্ত্র রাজবংশী জাতিমানসে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি সঞ্চালিত করে ‘হিন্দু’ বানানোর প্রক্রিয়া চলে ১৯২০-র দশকে। এরপর ১৯৩০-এর দশকে এক এক করে আসে সত্যাগ্রহের নামে ‘অচ্ছুৎ’ তফশিলিদের জন্য হঠাৎ করে মন্দিরের দরজা খুলে দেওয়া, ক্ষত্রিয় পরিচয় প্রদান এবং হিন্দু মহাসভার উদ্যোগে হিন্দুমেলার আয়োজন।১৯৩২ এর এপ্রিলে সমগ্র বাংলা প্রদেশে আয়োজিত হয় হিন্দু মেলা ৷এর লক্ষ্য ছিল মূলত নিন্মশ্রেণীর সদস্যদের " শুদ্ধ" করে তাদের হিন্দু হিসেবে অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত করা ৷এর ফলে ১৯৪১ এর শুমারি প্রকাশিত হলে দেখা যায় তাতে পূর্বের শুমারি (, ১৯৩১) চেয়ে বাংলায় তফসিলি জনসংখ্যা প্রায় ৮ লাখ কমে গেছে৷তফশিলিদের ‘শুদ্ধিকরণের’ মাধ্যমে হিন্দু পরিচিতির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়াই ছিল হিন্দুমেলার উদ্দেশ্য। অন্যদিকে এই সময় তফসিলি মতুয়া আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন গুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রপুত্র প্রমথরঞ্জন ঠাকুর। প্রমথরঞ্জন কোন রাজনৈতিক মিত্রের খোঁজ করেননি।রাজনৈতিক ব্রাহ্মণ্যবাদের স্বরূপও উপলব্ধি করতে পারেননি। এর ফলে জাতীয় কংগ্রেস ভোট বাক্সে প্রায় পুরো মতুয়া সম্প্রদায়কে হাইজ্যাক করে নিতে সফল হোন।এখন আবার মতুয়া সম্প্রদায় মনুবাদী বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক।জাতির প্রতি সামাজিক বঞ্চনার প্রশ্নটি ভুলে গিয়ে কৌমভিত্তিকভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদী দলের সঙ্গে হাত মেলানোর ভুল মতুয়া সম্প্রদায় আগেও করেছে, এখনও করছে। কিন্তু এরা বহুজনের আদর্শে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ে তুলতে পারলে দেশের ইতিহাস পাল্টে যেত।বাংলার রাজনীতির ধারা আজ অন্য খাতে বইত। বহুজনের রাজনৈতিক আদর্শকে বিকশিত হতে দেওয়া হয়নি বলেই এত বছর পরে আজও সংখ্যাগরিষ্ঠ অনগ্রসর ৮৫% এর উপর মাত্র ৬% দেশীয় উচ্চবর্গীয় এলিটের ছড়ি ঘোরানোর রাজনীতি বহমান।দেশভাগের এতবছর পরেও রাজনৈতিক ব্রাহ্মণ্যবাদের অবদমন থেকে তফসিলিদেরও মুক্তি ঘটেনি। তফসিলিরা তখন শ্রেণি ও জাতি পরিচিতি ভুলে ‘হিন্দু’ গর্বে গর্বিত হতে চেয়েছিল ,এখনও সেই ভুল করে চলেছে। কিন্তু তাদের এই ‘হিন্দু’ পরিচিতি যে রাজনৈতিক সেটা তারা বুঝে উঠতে পারেনি। এর জন্য গান্ধীর " হরিজন আন্দোলন" অনেকাংশে দায়ী৷হিন্দু মহাসভা ও আর এস এস দলিতবহুজনদের লেঠেল হিসাবে ব্যবহার করেছে৷ এখন তো আবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে এদের এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে ,যা একটি মনুবাদী শোষণ ও শাসনপদ্ধতির কৌশল৷ ফলে যোগেন মন্ডলের এহেন প্রতিনিধিত্বমূলক বহুজনবাদী রাজনীতির অপমৃত্যুর ফলস্বরূপ বাংলার ইতিহাসচর্চা ও রাজনৈতিক পরিসরটি কেবল হিন্দু-মুসলিম ভাষ্যে আঁটকে থেকে গেল।জাতিবৈষম্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদবিরোধী বহুজনের আদর্শ রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্র থেকে হারিয়ে গেল। এই হারিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক কন্ঠস্বর ছিলেন যোগেন মন্ডল৷ আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক আকুতির বিষয়ে কত সচেষ্ট ছিল তার প্রমান ১৯৩৭ এর নির্বিচনে অসংরক্ষিত আসনে স্বতন্ত্র হয়েও কংগ্রেসের কায়স্থ প্রার্থীর বিপরীতে নমশূদ্র যোগেন মন্ডলের বিজয়৷এই বিজয় যোগেন মন্ডলকে ক্রমে ভারতবর্ষের জাতীয় রাজনীতিতে ঠেলে দেয় ৷তফসিলিদের নতুন এক রাজনৈতিক চিন্তাসহ বাংলার ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ দশকে (১৯৩৭-৪৭) কীভাবে দলিতবহুজন সম্প্রদায়ের বহুজনবাদী রাজনীতি বিকাশ ঘটেছিল এবং কী ভাবে পরবর্তী দশকগুলোতে (১৯৪৭-৬৭) শেষপর্যন্ত তি আক্রান্ত ও পরাস্ত হয়েছিল ,এর ঐতিহাসিক পর্যালোচনা দরকার৷সুভাষচন্দ্র বসুকে ঘিরে নতুন রাজনীতির স্বপ্ন দেখতেন যোগেন মন্ডল৷ ১৯৩৭ এ এম এল এ হওয়ার পর ১৯৪০ এর জুনে বরিশালেও নিয়ে এসেছিলেন সুভাষকে৷ যোগেনের রাজনৈতিক জীবন ভারত পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য ততটা উচ্চকিত ছিল না ,যতটা না উচ্চকিত ছিল শূদ্রদের জন্য সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে৷ সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে যোগেনের মৈত্রীকে এগোতে দেয়নি ব্রাম্মণ্যবাদী কংগ্রেস৷ ১৯৪১এর পর যোগেন মন্ডল জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসেন ,যে রাজনীতিতে ছিল মূলত হিন্দু ভদ্রসমাজের আধিপত্য৷ পূর্ববঙ্গের অভিজ্ঞতার পাটাতনে দাঁড়িয়ে এ সময় তিনি ভাবতে শুরু করেন ,ভারতবর্ষে দলিত ও মুসলমানরা হলো প্রধান দুই নিপীড়িত বরগ ,এদের ঐক্য প্রয়োজন৷১৯৪২ এর জুলাই মাসে যোগেন রসিকলাল বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন তফসিলি নেতাকে নিয়ে নিখিল ভারত শিডিউল কাস্ট ফেডারেশনের নাগপুর অধিবেশনে যোগ দেন৷ এভাবেই ১৯৩৭ এর বঙ্গীয় আইনসভায় নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো যোগেনের রাজনৈতিক জীবনে নতুন মোড় ফেরার ঘটনাটি ঘটে৷ এটা একই সঙ্গে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ সময়পর্বে বাংলার রাজনীতিতে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দেয়৷ এটাই ছিল বাংলার উচ্চ ও নিন্মবর্ণের মানুষের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী বোঝাপড়া৷ একজন তফসিলির বিজয় দেখাতে তখনকার প্রচারমাধ্যমও যে প্রস্তুত ছিল না , তার সাক্ষ্য হিসেবে দেখা যায় ,অমৃতবাজার পত্রিকায় " ভোটের ফলাফলটি প্রকাশের সময় শিরোনামে পরাজিত ব্যক্তির নাম নিলেও বিজয়ী ব্যক্তির নাম ছিল অনুল্লোখিত৷ ১৯৩৭ এর ওই নির্বাচনে বাংলায় ২৫০ টি আসনের মধ্যে শিডিউল কাস্টরা জিতেছিলেন ৩২ টি আসনে৷ তবে যোগেন মন্ডল ছাড়া তফসিলিদের বাকি আসনগুলো ছিল সংরক্ষিত আসন ৷ সে সময় তিনি কংগ্রেস ও ফজলুল হকের সঙ্গী না হয়ে শূদ্রদের পক্ষে একটা নতুন রাজনীতি নির্মাণ করতে চাইছিলেন৷ বাঙালি সমাজের ছোটলোকদের নতুন এক রাজনৈতিক সত্তা আকারে হাজির করতে চাইলেন৷ নির্বাচিত এম এল এ হিসেবে তিনি গঠন করলেন" ইনডিপেনডেন্ট শিডিউল কাস্ট অ্যাসেম্বলী পার্টি" ৷ফলে মূলধারার শহরের এলিট রাজনীতি তৎকালীন ছকটি পাল্টে দিয়ে ছিলেন৷মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল যিনি প্রথমেই ঘোষণা করছেন-
“ব্রাহ্মণের পদধূলি গ্রহণ এবং মন্দিরে প্রবেশের দ্বারা আপনাদের কোনও উপকার ও দুঃখ-কষ্ট লাঘব হইবে না। কে আপনাদের দুঃখ-কষ্টের অবসান করিবে এবং অন্যান্যদের সঙ্গে সমান অধিকার প্রদান করিবে, তাহাই চিন্তা করিতে হইবে।”
বর্ণহিন্দুুরা চিরটাকাল নমঃশূদ্র, রাজবংশী, ধাঁঙর, মেথর, ডোম সহ শূদ্রদের উপর অত্যাচার শোষণ করে গেছে,আজও সেই জাত দেখে হত্যাযজ্ঞ চলছে৷যখন দেশে শাসক রূপে হিন্দু হৃদয় সম্রাট বিরাজমান তখনও জাতপাতের নামে বৈষম্য ,অত্যাচার ,গণহত্যা দেখা যাচ্ছে দেশ জুড়ে৷ এই অত্যাচারীত ,বঞ্চিত ,নিপীড়িত তপশিলি ও নমঃশূদ্রদের এগিয়ে নিয়ে চলা ছিল যোগন মন্ডলের একমাত্র ধ্যান জ্ঞান।তাই
যোগেনের বক্তব্য ছিল " ছোটলোকদের এক হওয়া প্রয়োজন"৷কিন্তু এখনও আধ্যাত্মিক অগ্রগতির জন্য ব্রাহ্মণবাদের দিকে তাকিয়ে থাকে দলিতবহুজনরা।আজও ব্রাহ্মণদের এবং তাদের রচিত সাহিত্যের আঙুলের নীচে চেপে আছে বহুজনবাদীরা ৷এই জন্য তিনি বলেছেন
“আত্মীয় ও বন্ধু যতই প্রিয় হউক জাতির বৃহত্তর স্বার্থ তদপেক্ষা প্রিয়তর-এ কথা সর্বদা স্মরণে রাখিবেন। জাতীয় স্বার্থকে বলি দিয়া আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের খাতিরে যদি কেউ ভুল পথে চালিত হন তবে তিনি জাতির ঘোরতর শত্রুতা করিবেন।”
১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে সারা ভারতবর্ষে তপশিলী ফেডারেশন থেকে একমাত্র জয়ী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল৷ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলে নির্বাচিত সদস্য পদ বাতিল করবার জন্য কংগ্রেস তথা ব্রাম্মণ্যবাদী শক্তি পরাজিত কামিনী কুমার সমাদ্দারকে দিয়ে কেস করায়৷ কিন্তুহষযযভভভষহ ৮/২/১৯৪৬ তারিখে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলকে জয়ী ঘোষণা করেন৷ ব্রাম্মণ্যবাদী কংগ্রেস জানত বঙ্গপ্রদেশে যোগেন মন্ডলই হল তপশিলী সমাজের অধিকার রক্ষার আন্দোলন অন্যতম ব্যক্তিত্ত্ব৷ তাই যোগেন মন্ডল যেন বিধান পরিষদে প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য ব্রাম্মণ্যবাদীরা ষড়যন্ত্র করে গেছে৷১৯৪৬ সালের নির্বাচনে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল জয়ী না হলে বাবাসাহেব আম্বেদকরকে গণপরিষদে পাঠানো সম্ভব হতো না৷ আর বাবাসাহেব যদি সংবিধান সভায় যেতে না পারতেন তাহলে এই দেশের সংবিধান ব্রাহ্মণদের পক্ষেই লেখা হ’ত।১৯৪৬ সালের ২৪ শে এপ্রিলের আগে পর্যন্ত শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে তপশিলী সমাজের কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বার সুযোগ পেত না ৷ঐ কলেজ ব্রাম্মণ্যদের ছিল একচেটিয়া অধিকার৷প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভার সদস্য হিসাবে শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর মোয়াজ্জেমুদ্দিন হোসেনের সহযোগিতায় ১৯৪৬ সালে যোগন মন্ডলের একান্ত প্রচেষ্টায় তপশিলী সমাজের ছাত্রদের সর্বপ্রথম শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়বার সুযোগ হয়৷শুধু তাই নয় ,ঐ কলেজের ছাত্রাবাসে ব্রাম্মণ ছাড়া কারো থাকবার অধিকার ছিল না ৷ তাই তপশিলী এবং মুসলমান ছাত্রদের জন্য সরকারি সহযোগিতায় ছাত্রাবাস তৈরি করেন৷১৯৪৬ এর কলকাতা দাঙ্গার পর হিন্দু নেতৃত্বের অনেকেই যোগেন মন্ডলের পদত্যাগের দাবী তুলে৷ যোগেন মন্ডল বলে ছিলেন " এই দাঙ্গা কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয় ,এটা হলো কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যকার রাজনৈতিক যুদ্ধ৷১৯৪৬ সালের দাঙ্গা ছিল বাঙলা বিভাগ এবং একটা পৃথক হিন্দু আবাসভূমি গঠনের জন্য হিন্দু রাজনৈতিক আন্দোলন৷জয়া চ্যাটার্জী বলছেন -কলকাতা দাঙ্গা নয় ,গৃহযুদ্ধ ,হিন্দু পক্ষে এটা ছিল বাঙলা ভাগের লড়াইয়ের একটা অংশ বিশেষ৷কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বর্ণহিন্দুদের বিবেচনায় যোগেনের কারণেই পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান হয়েছিল ৷ যে জন্য তাঁরা যোগেনকে বলতেন ' যোগেন আলী মোল্লা"৷কিন্তু বাংলা ভাগের প্রবল বিরোধিতা করে ছিলেন যোগেন মন্ডল। কারণ তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বাংলা ভাগ হলে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পূর্ববঙ্গের নমঃশুদ্র সম্প্রদায়৷ ১৯৬০-১৯৬৪ সালে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ায় কংগ্রেসী এবং ব্রাম্মণ্যবাদী শক্তি তাঁকে দু'বার জেল বন্দী করে রাখে৷ যোগেন মন্ডল যাতে কোন দিনই বিধান সভা এবং লোকসভায় প্রবেশ না করতে পারেন তার জন্য বাম ,কংগ্রেস ,বর্ণবাদী হিন্দুমহাসভা সমস্ত রকম ষড়যন্ত্র করেছে৷ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল ছিলেন ব্রাম্মণ্যবাদী রাজশক্তির কাছে মহাআতঙ্ক৷ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল আইন সভায় যাতে না যেতে পারে তার জন্য বিভিন্ন ভাবে ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল৷মহাপ্রান যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের অনন্য সাধারণ কর্মের মধ্যে তিনটি কাজের উল্লেখ করছি। যে কাজগুলি সত্যিই অনন্য সাধারণ। সে কাজগুলি দ্বিতীয় বার আর কেউ করে দেখাতে পারেননি। আর পারবেন কিনা সন্দেহ। সেই কাজগুলি হচ্ছে-
১. বাখারগঞ্জ সাধারণ সিটে জয় লাভ।
২. সংবিধান সভায় বি. আর. আম্বদেকরকে পাঠানো।
৩.১৯৬৫ সালের বি.ন. লকুর কমিটির সুপারিশ রদ করে নমঃশুদ্র, সুড়ি, ধোবা ও রাজবংশীদেরকে Scheduled Caste এর মধ্যে অন্তর ভুক্ত রাখা।
১৯৬৩ সালে আম্বেদকরের নেতৃত্বে গঠিত রিপাবলিকান পার্টির পশ্চিমবঙ্গ শাখা প্রতিষ্ঠা করেন যোগেন এবং সংগঠনের রাজ্য সভাপতি হোন৷এই দল থেকেই ১৯৬৪ সালে তিনি হাঁসখালি থেকে উপনির্বাচনে অংশ নেন এবং পরাজিত হন৷ ১৯৬৮ এ ৫ অক্টোবর ৬৪ বছর বয়সে বনগাঁয়ে মারা যান যোগেন মন্ডল৷
যোগেন মন্ডলের মৃত্যু ভারতে যেমন বর্ণহিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদদের একাংশকে স্বস্তি দিয়েছিল৷আবার পশ্চিমবঙ্গের তাঁর শেষ যুদ্ধ- এর ব্যর্থতার ফল হয়েছিল এ রকম ,প্রায় চল্লিশ বছর সেখানে " বামপন্থী" সরকার থাকার পরও দলিত নমশূদ্র ও মুসলমানদের আর্থসামাজিক -রাজনৈতিক বঞ্চনার লক্ষণীয় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি৷
নয় কোটি জনসংখ্যার এই রাজ্যে সংখ্যার হিসাবে তারা প্রায় ২৪ শতাংশ ৷রাজ্যের সমগ্র হিন্দু জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ৷ পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশ মিলে এখনো প্রায় পৌনে তিন কোটি শিডিউল কাস্ট মানুষ রয়েছে৷বাংলার রাজনীতিতে পূর্বের মতো বর্ণহিন্দুদের আধিপত্য চলছে এখনও ৷ আবার বর্ণহিন্দু নেতৃত্বে এবং দলগুলো হিন্দু বনাম মুসলমান যে বিভাজনরেখা তৈরি করতে তৎপর ৷ তারও লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সমাজে দলিত নমশূদ্রদের বঞ্চনা কে গুরুত্বহীন করা এবং মুসলমানদের মোকাবিলায় 'য় নমশূদ্র পরিচয় মুছে " একক হিন্দু অবস্থান" তৈরি করা ৷এর বিপরীতে বামপন্থীদের সমাজতান্ত্রিক আদর্শতাড়িত শ্রেনিধারণাভিত্তিক সমাবেশীকরণ প্রক্রিয়া ব্রাম্মণ্যবাদভিত্তিক শোষণের বাস্তবতাটি অগ্ৰাহ্য করা ৷১৯৮০ এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু " পশ্চিমবঙ্গের জাতিভেদ নেই" বলে মন্ডল কমিশনের সুপারিশ গ্ৰহণ করতে অস্বীকৃত জানিয়েছিলেন৷ কিন্তু বাংলা থেকে বর্ণভিত্তিক রাজনীতি বিদায় ঘটেছে ,এমনটি বলা যায় না৷ পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের দীর্ঘ শাসনের শেষলগ্নে(২০০৬-১১) রাজ্যের মন্ত্রীপরিষদের ব্রাম্মণ মন্ত্রী ছিলেন প্রায় ৪১ শতাংশ৷ তথচ জনসংখ্যায় তাদের হিস্যা মাত্র ২ শতাংশ৷ ১৯৭৭ সালে পশ্চিম বাংলায় বামফ্রন্ট যখন ক্ষমতায় এসেছিল ,তখন একজন ও দলিত মন্ত্রী ছিল না৷ যদিও এখনো পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে কোনো দলিত মূখ্যমন্ত্রী হতে পারেননি৷ এবং মুসলমান ও দলিতদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার নজির খুবই কম৷ চাকরি ক্ষেত্রে উপরিক্রম ধাঁচের বঞ্চনার বহাল আছে৷ এভাবে বর্ণবাদ ঠিকে আছে বলেই বাংলা ভাগকালে হারিয়ে ফেলা "নমশূদ্র পৌন্ড্র বাগদি মুসলমান ঐক্যের " রাজনীতি পরিসরটি নতুন করে পুননির্মাণের চেষ্টা করছে নিন্মবরগরা ৷এটা কেবল পশ্চিমবঙ্গেই ঘটছে না ৷ বাকি ভারতেও দেখা যাচ্ছে ৷কিন্তু দেশভাগের পর থেকে বর্ণবাদী আধিপত্য বিনা শর্তে মেনে নিয়েও ঝাড়খণ্ড, বিহার বা উত্তরপ্রদেশ তফসিলি নেতৃত্ব পেয়েছে, কিন্তু পশ্চিমবাংলার মানুষ ভাবতেই পারেন না যে এ রাজ্যে কিস্কু, হেমব্রম, মূর্মু, মাহাত বা বাউরি বাগদি কোটাল, দলিতবহুজনরা মুখ্যমন্ত্রী হবেন? কারন বাংলায় যাবতীয় গণআন্দোলনের শৌখিন মুখ হয়ে পোষ্টার আলো করেছে উচ্চবর্গীয় শ্রেণি৷কারন রাজনীতি তৈরি হয় অর্থনীতির উপরে ভিত্তি করে৷তফশিলিরা নিজেরা লড়ার ক্ষেত্র পায়নি ফলতঃ ব্রাহ্মণ্যবাদকে ধাক্কা দেওয়ার মতো কোন শক্তিশালী তফসিলি আন্দোলন গড়ে ওঠেনি বাংলায়। ভারত তথা বাংলার রাজনীতিতে যে শ্রেণিবৈষম্যের সঙ্গে জাতিবৈষম্যের প্রশ্নটি অতঃপ্রতভাবে জড়িত সেটা বামেরা এড়িয়ে গেছে এবং এখনো এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।প্রথম সারির তফসিলি নেতা উঠেই এল না গত ৩৪ বছরে। উঠে না আসার আসলকারণটি নিহিত রয়েছে যোগেনের বহুজনবাদী আদর্শকে উৎসমূলে পিষে মেরে ফেলার ইতিহাসে। এর দায় বাংলার সমস্ত সুপ্ত ব্রাহ্মণ্যবাদী দলের। অধুনা তৃণমূলের জমানাতেও সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে৷ভারতীয় কমিউনিস্টরা দলিতবহুজন সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল৷ কারন ভারতের সমস্ত প্রতিবাদ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্রাম্মণ্যবাদ৷তবে ,ব্রাম্মণ্যবাদ বিরোধিতা কেবল ব্রাম্মণদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না ৷ বরং তাদের মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্যকারী সমস্ত অ-ব্রাম্মণদের বিরুদ্ধেও সীমাবদ্ধ থাকতে পারে ৷ ব্রাম্মণরা নিজেরাই ব্রাম্মণ্যবাদের শিকার৷ তাই ব্রাম্মণ্যবাদে বিরুদ্ধে যোগেন মন্ডলের বহুজনবাদ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একমাত্র মুক্তির পথ৷শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় ,পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে নিপীড়িত বরগের মানুষের বেঁচে থাকার আদর্শ হচ্ছে "বহুজনবাদ" ৷ যোগেন মন্ডল জীবনের শেষলগ্নেও তাঁর দলিত ও বহুজনবাদী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুতি হননি৷ তবে ভারত ,পাকিস্তান ,বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নিন্মবরগরা যোগেনের সেই বহুজনবাদী রাজনীতিরই সন্ধানে আছে আজও৷এমনকি হালের রোহিঙ্গা সংকটও দক্ষিণ এশিয়ায় বহুজনবাদী রাজনীতির অনুপস্থিজনিত সংকটের কথাই জানান দিচ্ছে৷ একই শূন্যতার কথা বলছে ভারতের কাশ্মীর ,পাকিস্তানের বালুচ ,শ্রীলঙ্কার তামিল ,নেপালের মধেস ,বাংলাদেশের চাকমা -সাঁওতালরা ৷
তথ্যসূত্র:
১. যোগেন মন্ডলের বহুজনবাদ ও দেশভাগ- আলতাফ পারভেজ
২.বাংলায় তফসিলিদের হিন্দুকরণের ইতিহাস ও যোগেন মন্ডল -আশরাফুল আমিন (প্রবন্ধ)
৩.মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল - জগদীশচন্দ্র মন্ডল।
৪. ব্রাম্মণ্য ভাবধারা ও আধুনিক হিন্দুমন - অশোক রুদ্র
৫. আত্মবিস্মৃত বাঙালি:- ইঙ্গ -ব্রামণ্যবাদ ও বাঙালীর ভাগ্য বিপর্যয়ের পর্যালোচনা-রইসউদ্দিন আরিফ
লিখেছেন :