About Us | Contact Us |

চাষির ছেলে পাপ্পু মাঝি কারে দেবে ভোট!

চাষির ছেলে পাপ্পু মাঝি কারে দেবে ভোট!

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফা ভোট ২৩ এপ্রিল। গ্রামবাংলার মাটিতে এখন কেবল ধানের গন্ধ নয়, রাজনীতির উত্তাপও সমান তালে ছড়িয়ে পড়েছে। মাঠে ফসল যেমন দুলছে, তেমনই দুলছে চাষির মন—কার দিকে যাবে তার ভোট?

 

এই গল্পটা পাপ্পু মাঝির। বোলপুরের এক ছোট গ্রামে থাকে সে। বাবা চাষি, বড় ভাই বাবার সঙ্গেই জমিতে কাজ করে। পাপ্পু নিজে বেকার—সরকারি “বেকার ভাতা” হিসেবে মাসে ১৫০০ টাকা পায়, বছরে মোট ১৮,০০০ টাকা। এই টাকায় তার নিজের খরচটুকু চলে, কিন্তু সংসারের বড় বোঝা তো বাবার কাঁধেই।

 

পাপ্পুর বড় ভাই পায় “কৃষক বন্ধু” প্রকল্পের সুবিধা। বছরে জমির পরিমাণ অনুযায়ী প্রায় ৫,০০০ টাকা প্রতি একর হিসাবে আর্থিক সাহায্য আসে। পাশাপাশি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হলে ২ লক্ষ টাকার বীমাও রয়েছে। কাগজে-কলমে হিসেব মন্দ নয়। কিন্তু বাস্তবের মাঠে দাঁড়ালে হিসেবটা যেন মেলে না।

 

এই বছর আলুর দাম নিয়ে যে টানাপোড়েন, তা পাপ্পুদের গ্রামেও স্পষ্ট। রাজ্য সরকার আলুর জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) ঘোষণা করলেও, বাজারে সেই দাম সব সময় মিলছে না। ফড়েরা কম দামে কিনতে চাইছে, কোল্ড স্টোরেজের খরচ বাড়ছে—ফলে চাষির লাভ কোথায়? পাপ্পুর বাবা বলছিলেন, “কাগজে দাম আছে, কিন্তু হাতে টাকা আসে না।”

 

রাজ্য সরকার একদিকে কৃষক বন্ধু, খেত মজুর প্রকল্প, সস্তায় শস্য—এইসব সামাজিক সুরক্ষা জাল তৈরি করেছে। অন্যদিকে কেন্দ্রের নানা কৃষিনীতি, MSP নিয়ে বিতর্ক, কৃষি আইন নিয়ে আগের আন্দোলনের স্মৃতি—সব মিলিয়ে একটা দ্বৈত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চাষি বুঝতে পারছে না, তার প্রকৃত উপকার কে করছে—রাজ্য না কেন্দ্র?

 

এবার ভোটের ময়দানে নামা বড় দলগুলিও চাষিদের ঘিরেই প্রতিশ্রুতির ঝাঁপি খুলেছে।

 

তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, তারা কৃষক বন্ধু প্রকল্পের আর্থিক সাহায্য বাড়াবে, খেত মজুরদের জন্য আরও সামাজিক সুরক্ষা দেবে, এবং MSP কার্যকর করতে রাজ্যস্তরে উদ্যোগ বাড়াবে।

 

ভারতীয় জনতা পার্টি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কেন্দ্রীয় MSP ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করবে, সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে অর্থ পৌঁছে দেবে, এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাবে।

 

সিপিএম তথা বামপন্থীরা বলছে, কৃষির জন্য আলাদা ন্যায্য মূল্য কমিশন, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা জোরদার, এবং কৃষি ঋণ মকুবের মতো বড় পদক্ষেপই একমাত্র পথ।

 

কিন্তু পাপ্পুর প্রশ্নটা সহজ—“আমার বাবার ফসলের ঠিক দাম কে দেবে?”

সে দেখে, তার নিজের হাতে মাসে ১৫০০ টাকা এলেও, তার বাবার সার, বীজ, সেচের খরচ ক্রমেই বাড়ছে। বড় ভাই যে কৃষক বন্ধু পায়, তা বছরে একবার আসে—ততদিনে ঋণের চাপ জমে যায়।

 

গ্রামের আড্ডায় এখন একটাই আলোচনা—“কে আসলে চাষির?”

কারও মতে, যে সরাসরি টাকা দেয় সে ভালো। কারও মতে, যে ফসলের দাম নিশ্চিত করবে, সেই আসল বন্ধু।

 

পাপ্পু মাঝি ভোট দেবে ২৩ এপ্রিল। কিন্তু তার ভোট শুধু তার নিজের জন্য নয়—তার বাবার, তার ভাইয়ের, আর বাংলার হাজার হাজার চাষির জন্য।

 

শেষমেশ প্রশ্নটা থেকে যায়—

চাষির ছেলে পাপ্পু মাঝি কারে দেবে ভোট?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে মাঠের ফসলে, আর সেই ফসলের ন্যায্য দামে।

 

*গল্পটি কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে কোনো মিল নেই

ময়ূখ ভট্টাচার্য্য
ময়ূখ ভট্টাচার্য্য

কৃষি গবেষক