গণতন্ত্রের উৎসব নির্বাচন—আনন্দের সঙ্গে ভোট দিন, ইচ্ছে থাকলে আনন্দের সঙ্গেই ভোটে প্রতিযোগিতাও করুন। কিন্তু এই আনন্দে ভেসে থাকার দিনে আমরা যেন এমন কোনো কাজ না করি, যার ফলে আমাদের ঘরে নেমে আসে অন্ধকার।
ভোট, ভোট, ভোট—ভোট এসেছে কাছে। সঙ্গে যেন এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্যও এসে ঢুকেছে ঘরে ঘরে। প্রচারে কেউ চপ ভাজছে, তো কেউ দাড়ি কাটছে, তো কেউ উনুনে বসে রান্না করছে—কী অপার ভালোবাসাই না জেগে উঠেছে এই সময়ে! এই ভালোবাসা যদি সারা বছর থাকত, তাহলে আমরা কি এতটা পিছিয়ে থাকতাম? নিশ্চয়ই না।
কিন্তু এই ভালোবাসার মাঝেই কোথাও কোথাও ভেসে আসে অন্ধকারের আওয়াজ। কেউ ধর্মের নামে, কেউ আবার রাজনৈতিক প্রতিশোধের নামে মাঠ গরম করছে। অথচ আমরা বরাবরই জেনে এসেছি—নির্বাচন এক উৎসব, যা বইয়ের পাতায় যেমন লেখা আছে, তেমনি বাস্তবেও হওয়া উচিত। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা দলমত নির্বিশেষে—সবার অংশগ্রহণে উদযাপিত হয় এই গণতন্ত্রের উৎসব।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ঠিক এই সময়েই কিছু নেতার উস্কানিতে গরিব মানুষের ঘরে নেমে আসে বিপর্যয়। মায়ের কোলে রক্তাক্ত সন্তানের শরীর, সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছেলেকে হারিয়ে ফাঁকা হয়ে যাওয়া ঘর—এই বাস্তবতা বড় নেতাদের চোখে পড়ে না। তারা আসে, কিছু বড় বড় কথা বলে, সেলফি তোলে, আর চলে যায়। কিন্তু ক্ষত থেকে যায় সেই সাধারণ মানুষের জীবনেই।
প্রতি বছরের মতো এবারও সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে, বরং কিছু ক্ষেত্রে আরও ভয়াবহ এবং একটু আলাদা রূপে। এবার আলাদা এক চিত্র দেখা যাচ্ছে যে বিধানসভা কেন্দ্রে কোনো একটি দলের জয়ের সম্ভাবনা কম, সেখানে সেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিচুতলার কর্মীদের উস্কে দিচ্ছে অযথা বিক্ষোভে নামতে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তা মারামারি বা দাঙ্গায় রূপ নেয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ কর্মীরাই—যারা নিজেরাও গরিব।
একইভাবে ধর্মের রাজনীতিতেও দেখা যাচ্ছে—যেখানে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে মুসলিমদের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে,আর যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে হিন্দুদের। ফলে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে দুই পক্ষের সাধারণ মানুষই। যারা মার খাচ্ছে তারা যেমন গরিব, যারা মারছে তারাও কিন্তু গরিব। একজন তাৎক্ষণিকভাবে আঘাত পাচ্ছে, আরেকজন কয়েকদিনের মধ্যেই আইনের জালে পড়ে শাস্তি পাচ্ছে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতি কার?—সাধারণ মানুষেরই।
অন্যদিকে, এই ঘটনাগুলোকে ব্যবহার করে বড় নেতারা রাজ্যজুড়ে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করছে। অথচ বাস্তবতা হলো—নির্বাচন শেষে আবার আপনাদেরই একসঙ্গে বসবাস করতে হবে। মাঝরাতে আপনার পরিবারের কারও শরীর খারাপ হলে, প্রথম সাহায্য কিন্তু আপনার পাশের বাড়ির মানুষই করবে—সে যে কোনো ধর্মের বা দলের হোক না কেন।
তাই আমার পশ্চিমবঙ্গের সকল মানুষকে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দলমত নির্বিশেষে, একটাই অনুরোধ—নিজের অবস্থানটা নিজে বুঝুন। আজ আপনি কাউকে মারলে, কাল আপনাকেই আইনের মুখোমুখি হতে হবে। আর আজ আপনি মার খেলে, সেই কষ্ট আপনাকে, আপানার পরিবারকেই সহ্য করতে হবে। রাজনৈতিক নেতারা আসবে, কথা বলবে, ছবি তুলবে—কিন্তু আপনার জীবনের দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে।
আপনি আপনার পছন্দের দলের হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রচার করুন। আপনার মতাদর্শ, আপনার বিশ্বাস—মানুষের কাছে পৌঁছে দিন ভালোবাসা ও যুক্তির মাধ্যমে। এটি আপনার সাংবিধানিক অধিকার, আপনার গণতান্ত্রিক অধিকার। প্রতিবাদ করুন, কথা বলুন—মানুষ শুনবে, প্রশাসনও শুনবে। কিন্তু সেটি হতে হবে সম্প্রীতি ও শান্তি বজায় রেখে।
শেষে একটাই কথা—নির্বাচন এসেছে, গণতন্ত্রের উৎসব এসেছে। আসুন, আমরা সবাই মিলে এই উৎসব উদযাপন করি। আনন্দের সঙ্গে ভোট দিই, নিজের পছন্দের প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করি। জিতলে শান্তিপূর্ণভাবে আনন্দ করি, হারলে সাহসের সঙ্গে সেই হারকে মেনে নিই।
এটাই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য।