ইরান‑ইসরায়েল‑যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন টুইস্ট ও 'ইউয়ান' এ পরিশোধিত তেল ট্যাংকার 'করাচি' ছাড় প্রাপ্তি।
যুদ্ধ কখনোই এক দ্বিপাক্ষিক সংঘাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ইরান ও ইসরায়েল‑যুক্তরাষ্ট্রের মৈত্রীসৃষ্ট সংঘাত সেই পুরনো ধারণাটিকে আরও চ্যালেঞ্জ করে তুলেছে, বিশেষ করে যখন এর গ্রহনশক্তি, কৌশলগত সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রভাবগুলি এশিয়ার দক্ষিণ ও মধ্য অংশে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরায়েল জোট:
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বিরোধ কেবল একটা আঞ্চলিক সংঘাত নয়, এটা বিশ্বব্যাপী শক্তির দাবার একটি বড় অধ্যায় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল যখন আমেরিকার সমর্থন নিয়ে ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছে, তখন টানাপোড়েন দ্রুত মধ্যপ্রাচ্য ছড়িয়ে গিয়েছে। এই যুদ্ধের ফলে তেল, গ্যাস ও সমুদ্র পথগুলোতে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, ফলে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ চেইনেও ব্যাঘাত দেখা দিয়েছে।


দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি—ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান:
ইরান‑যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরায়েল যুদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য সাধারণ “বিচ্ছিন্ন বাহ্যিক সংঘাত” থেকে বের হয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক‑কৌশলগত ভাবনায় প্রবেশ করেছে।
ভারত অন্যান্য দেশের মতো নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যস্ত, বিশেষ করে সরবরাহ ব্যবস্থায় ভঙ্গ হলে তা দেশের বাজারে দাম বৃদ্ধি করে দিয়েছে, খাদ্য ও জ্বালানি আমদানি খাতে চাপ সৃষ্টি করেছে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় জ্বালানি রুট খোলার মতো কূটনৈতিক সফলতা ভারতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে ফেলেছে যা মোদী সরকারের কূটনীতি‑ভিত্তিক কার্যক্রমকে ভারত ইরানের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সম্পর্ককে হুমকির মুখে ফেলেছে। এরমধ্যে ইরান ভারতের দুটি গ্যাসবাহী জাহাজকে ছাড় দিয়েছে বিনিময়ে ইরান ভারতের কাছ থেকে কি চাচ্ছে তা এখনও স্পষ্ট না।
ওদিকে পাকিস্তান অত্যন্ত জ্বালানি‑নির্ভর দেশ হিসেবে ইরান‑আক্রান্ত শক্তির প্রভাব মোকাবিলায় কৌশলগতভাবে বিবেচনা করছে। একট পাকিস্তান‑বাহিত তেল ট্যাঙ্কার 'করাচি' চীনা মুদ্রা 'ইউয়ানে' মূল্য পরিশোধের প্রমাণ সাপেক্ষে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে—যা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের মাঝেও নিরাপদ চলাচলের একটি ইঙ্গিত দেয় এবং 'পেট্রো ডলারের' সংজ্ঞাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান বারবার বলছে যে যুদ্ধের কারণে এর ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হতে পারে, এবং সে কারণে এটা অবলম্বন করছে একমাত্র পক্ষের প্রতি নির্ভর না করে সামগ্রিক ভারসাম্য কৌশল।
আবার আরেক দিকে, আফগানিস্তান নিজ অবস্থানকে একক শক্তির প্রতি আনুগত্য না রেখে, বহুপাক্ষিক কূটনীতি হিসেবে ধরেছে এবং ইরান‑যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ফলে তার নিজেদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা খাতে চ্যালেঞ্জ বৃদ্ধি পেয়েছে।এটা স্পষ্ট যে আফগানিস্তান এখন শক্তির বৃহত্তর সংঘর্ষে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে চাইছে না, বরং সে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ:
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু সীমান্তিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ নয়,এটা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা, দাম‑ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যে বড় চাপ তৈরি করছে। সরবরাহ পথগুলোর ব্যাঘাত ও তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বাজার‑ব্যবস্থা অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইরান‑ইসরায়েল‑যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের সীমাবদ্ধ বিষয় নয়, এটা একটা বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, যার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার দেশের কৌশল, নিরাপত্তা চিন্তা ও কূটনীতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান প্রতিটা নিজ নিজ ভূরাজনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী অবস্থান নির্ধারণ করছে,এতে আর কোনো এক শক্তির প্রতি ‘দ্বিমুখী আনুগত্য’ কোথাও দেখা যাচ্ছে না বরং একটা নতুন ধরনের বহুপাক্ষিক ভারসাম্য কূটনীতি দৃশ্যমান হচ্ছে। যা ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
লিখেছেন :