About Us | Contact Us |

জনতাই বৈধতা

জনতাই বৈধতা

সকল বিজেপি - আরএসএস বিরোধী রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠীকে এক্ষুনি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম মূল তাত্ত্বিক স্তম্ভ ‘জনপ্রিয় সার্বভৌমত্ব’ (Popular Sovereignty) নামক আইনি লব্জটির দিকে নজর দিতে অনুরোধ করছি। এর সারকথা অত্যন্ত স্পষ্ট: রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। কোনো রাজা, সম্রাট বা স্বঘোষিত নেতা নন, বরং সাধারণ নাগরিকদের সম্মতি ও ইচ্ছার ওপরই সরকারের কর্তৃত্ব নির্ভরশীল (Locke, 1689; Rousseau, 1762)। এই নীতি শুধুমাত্র একটি দার্শনিক ধারণা নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইন, সংবিধান ও বিচারবিভাগীয় রায়ের মাধ্যমে সুসংহত একটি আইনি বাস্তবতা। এই মুহুর্তের রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির জন্য আমাদের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, ভারতীয় সংবিধানের নির্দিষ্ট বিধান এবং পশ্চিমবঙ্গের চলমান নাগরিকত্ব সংকটের আলোকে জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বের আইনি যৌক্তিকতাকে বিশ্লেষণ করতে হবে।

 

জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে স্পষ্ট ও সর্বজনস্বীকৃত আইনি ভিত্তি পাওয়া যায় মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের (UDHR) ২১(৩) নম্বর অনুচ্ছেদে। সেখানে লেখা রয়েছে:

 

“জনগণের ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ই হবে সরকারী কর্তৃত্বের ভিত্তি” (UN General Assembly, 1948, Article 21(3))।

 

এই অনুচ্ছেদটিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ‘আইনি সনদ’ বলা চলে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কোনো সরকারের বৈধতা শেষ পর্যন্ত জনগণের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। একই ঘোষণাপত্রের ২১ নং অনুচ্ছেদের পূর্ববর্তী ধারাগুলো প্রতিটি নাগরিকের সরাসরি বা স্বাধীনভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশের শাসনকার্যে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করে। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR, 1966) -এ এই অধিকার আরও সুসংহত করা হয়েছে, যেখানে মানবাধিকার কমিটি একে ‘জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের মূল কেন্দ্র’ বলে অভিহিত করেছে (UN Human Rights Committee, 1996)।

 

জাতিসংঘ সনদের (1945) প্রথম অনুচ্ছেদে ‘সকল জনগণের সার্বভৌম সমতার’ নীতি স্বীকৃত হয়েছে (UN Charter, 1945, Article 1(2))। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনের স্তরে জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের পণ্ডিতেরা (যেমন Crawford, 2006) জনপ্রিয় সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারের মধ্যে অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক দেখতে পান। এই নীতি অনুসারে, কোনো সরকার যদি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেই সরকারকে ‘অবৈধ’ বলে চিহ্নিত করতে পারে এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাতে পারে।

 

 

ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতেই লেখা রয়েছে: “আমরা ভারতের জনগণ… এতদ্বারা আমাদের এই সংবিধান অঙ্গীকার করছি” (Government of India, 1950, Preamble)। এই একক বাক্যটির মধ্যে দিয়ে সংবিধানের মূল কর্তৃত্ব জনগণের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কার্যকর হওয়া এই সংবিধানের প্রস্তাবনা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে জনগণের ক্ষমতায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। প্রস্তাবনায় ‘সার্বভৌম’ শব্দটি যুক্ত করার মাধ্যমে জনগণের এই চূড়ান্ত কর্তৃত্বকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় নাগরিকরা সরাসরি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে লোকসভা, রাজ্য বিধানসভা ও স্থানীয় সংস্থার প্রতিনিধি নির্বাচন করেন।

 

সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে (ধারা ৫-১১) নাগরিকত্বের ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে (Government of India, 1950, Articles 5-11)। এরপর নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫ প্রণীত হয়, যা পরবর্তী সময়ে একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। এই আইন ও সংশোধনীগুলির মাধ্যমেই ভারতের নাগরিক কারা, তাদের অধিকার ও দায়িত্ব কী, তা নির্ধারণের প্রক্রিয়া স্থির করা হয়েছে (Government of India, 1955)। ‘জনগণ’ কারা—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্বও জনগণের হাতে ন্যস্ত, যার প্রতিফলন ঘটে সংবিধান ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে।

 

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বের নীতিকে সুসংহত করেছে। কেশবানন্দ ভারতী বনাম কেরল রাজ্য (1973) মামলায় প্রতিষ্ঠিত ‘মৌলিক কাঠামো’ (Basic Structure) তত্ত্ব এই নীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ (Supreme Court of India, 1973, (4) SCC 225)। ৭:৬ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সীমাহীন নয়—সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামো’ পরিবর্তন করা যায় না। এই মৌলিক কাঠামোর মধ্যে জনপ্রিয় সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র অন্যতম। এই তত্ত্বের মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে জনগণের সার্বভৌমত্ব এতটাই মৌলিক যে সংসদও তা বিলুপ্ত করতে পারে না।

 

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫-এর ধারা ৬এ-এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে। ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর, চার-এক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সুপ্রিম কোর্ট ধারা ৬এ-কে সাংবিধানিক বলে বহাল রাখে (Supreme Court of India, 2024, In Re Section 6A)। এই ধারা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে বাংলাদেশ থেকে আগত অভিবাসীরা নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী। রায়টি আরও নির্দেশ করে যে সাংস্কৃতিক উদ্বেগের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব অস্বীকার করা যায় না। এই রায় জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বের একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: কারা ‘জনগণ’—একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে আগত অভিবাসীরা কি সেই ‘জনগণের’ অংশ?

 

 

স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) হলো ভোটার তালিকা পরিষ্কার করার জন্য নির্বাচন কমিশনের একটি বিশেষ উদ্যোগ। পশ্চিমবঙ্গে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হয় (Election Commission of India, 2025)। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৭.৬৬ কোটি। SIR প্রক্রিয়ার এনুমারেশন পর্যায়ে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে, যা মোট ভোটারের প্রায় ৭.৫ শতাংশ। বাদ পড়ার কারণ হিসেবে মৃত্যু, স্থানান্তর, নামের পুনরাবৃত্তি ও ঠিকানা শনাক্ত করতে ব্যর্থতাকে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এই বিশাল সংখ্যক নাম বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দ্য হিন্দু (২৮ অক্টোবর ২০২৫) জানায়, বিরোধী দলগুলি ‘তড়িঘড়ি SIR প্রক্রিয়া’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া (২৫ অক্টোবর ২০২৫) একে ‘পিছনের দরজা দিয়ে NRC’ আনার চেষ্টা বলে অভিহিত করে। SIR প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আইনানুগতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

 

কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৪ সালের ১১ মার্চ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), ২০১৯ -এর বিধি (Rules) চূড়ান্তভাবে বিজ্ঞপ্তি করে (Ministry of Home Affairs, 2024)। এই আইনের আওতায় পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে প্রবেশ করা অমুসলিম অভিবাসীরা (হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, খ্রিস্টান) নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য।

 

২০২৬ সালের মার্চ মাসে, পশ্চিমবঙ্গে SIR-এর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের মাত্র দু’দিন পর, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পশ্চিমবঙ্গে CAA-র আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আরও দু’টি এমপাওয়ার্ড কমিটি গঠন করে। CAA সনদপত্র এখন ভোটার নিবন্ধনের জন্য বৈধ নথি হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু যাঁরা CAA-তে নাগরিকত্বের আবেদন করেছেন, তাঁদের আবেদনের রসিদ SIR-এ গ্রহণযোগ্য কিনা—এই প্রশ্নে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা হয়। একটি এনজিও আদালতে জানিয়েছে, আবেদন স্বীকারের রশিদ না মানায় এক গুরুতর সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে।

 

SIR প্রক্রিয়ার সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার কালিয়াচক এলাকায়। SIR-সংক্রান্ত মামলার শুনানি করতে আসা সাতজন বিচারিক আধিকারিককে (তিনজন মহিলা সহ) একদল প্রতিবাদকারী জনতা নয় ঘণ্টা ধরে জিম্মি করে রাখে (লোকমত টাইমস, ১ নভেম্বর ২০২৫)। সুপ্রিম কোর্ট এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং পশ্চিমবঙ্গকে ‘সবচেয়ে মেরুকৃত’ রাজ্য বলে আখ্যা দেয়। নির্বাচন কমিশন তদন্তভার ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (NIA) -এর হাতে তুলে দেয়। এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগে সাধারণ মানুষ যখন বিচারকদের জিম্মি করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত শুভ লক্ষণ নয়।

 

এই সংকটের সবচেয়ে জটিল দিক হলো SIR ও CAA-র মধ্যে সম্পর্ক। একদিকে SIR প্রক্রিয়ায় ব্যাপক নাম বাদ পড়ছে, অন্যদিকে CAA-র মাধ্যমে নতুন নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইন্ডিয়া টুডে (১৯ নভেম্বর ২০২৫) জানায়, ভোটার তালিকা ফেরিতে ভয়ে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে পালাচ্ছে। ভাঙরের একটি বুথে যাদের নাম বাতিল হয়েছে, তাদের মধ্যে ৫ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বলে প্রতিবেদনে দেখা গেছে। প্রশ্ন উঠছে: ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ও CAA-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া—এই দু’টি প্রক্রিয়া কি সঠিক সমন্বয়ের সঙ্গে চলছে?

 

বিজেপির দাবি, CAA ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার অমুসলিমদের নাগরিকত্ব দেবে। তৃণমূল কংগ্রেস বলছে, ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের পরিপন্থি। জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বের বিচারে, ‘জনগণের ইচ্ছা’ প্রকাশের এই প্রক্রিয়া কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (১৮ অক্টোবর ২০২৪) তার সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করে, নাগরিকত্ব বিতর্কে সুপ্রিম কোর্টের রায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সুর ধ্বনিত করেছে, কিন্তু তার সুষ্ঠু প্রয়োগ এখনই বড় চ্যালেঞ্জ।

 

পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্ব সংকট জনপ্রিয় সার্বভৌমত্বের নীতির সামনে তিনটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ রেখেছে:

 

প্রথমত, SIR প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া জনগণের ভোটাধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। মালদহের ঘটনা যেমন দেখিয়েছে, সাধারণ মানুষ যখন বিচারকদের জিম্মি করতে বাধ্য হয়, তখন তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ব্যর্থতাই নির্দেশ করে।

 

দ্বিতীয়ত, রাজ্য বনাম কেন্দ্রের দ্বন্দ্বে ‘জনগণের ইচ্ছা’ কার মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থানের মধ্যে টানাপড়েনে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছা নির্ধারণ করা কঠিন।

 

তৃতীয়ত, CAA-র ধর্মীয় ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদান এবং তা ধর্মনিরপেক্ষতার মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি কিনা—এই প্রশ্ন জনপ্রিয় সার্বভৌমত্ব ও মৌলিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য চায়। কেশবানন্দ ভারতী মামলায় প্রতিষ্ঠিত ‘মৌলিক কাঠামো’র অন্তর্ভুক্ত ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের মূল্যবোধ CAA পরীক্ষায় কতটা টিকবে, তা সময়ই বলে দেবে।

 

জনপ্রিয় সার্বভৌমত্ব শুধু একটি রাজনৈতিক দর্শন নয়; এটি একটি শক্ত আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দার্শনিক সত্য যা থেকে আইন তার বৈধতা পায়, অসংখ্য সংবিধানের লিখিত নির্দেশ, আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি এবং আদালতের সক্রিয় প্রয়োগ। মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২১(৩) অনুচ্ছেদ (UN General Assembly, 1948) বিশ্বব্যাপী এই নীতির ভিত্তি স্থাপন করেছে। ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা (Government of India, 1950) ‘আমরা ভারতের জনগণ’-এর মাধ্যমে এই নীতিকে সশব্দে ঘোষণা করেছে। কেশবানন্দ ভারতী মামলা (Supreme Court of India, 1973) ও আসাম ধারা ৬এ-র সাম্প্রতিক রায় (Supreme Court of India, 2024) এই নীতিকে চিরস্থায়ী করেছে।

 

তবে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্ব সংকট এই নীতির সামনে কঠিন বাস্তব চ্যালেঞ্জ রেখেছে। SIR প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব, CAA-র ধর্মীয় ভিত্তি ও মালদহের বিচারক ঘেরাওয়ের ঘটনা—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে: ‘জনগণের ইচ্ছা’ বলতে কী বোঝায়? কারা সেই জনগণের প্রতিনিধি? CAA-র মতো আইন কি সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভিত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

 

এই সব প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার শক্তিতেই। সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য জনগণের চূড়ান্ত কর্তৃত্বকে আইনত সংরক্ষিত ও সম্মানিত করা আবশ্যক। কোনো নাগরিক যেন ন্যায্য প্রক্রিয়া ছাড়া ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সকল রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কেবলমাত্র জনগণের ইচ্ছার প্রতি দায়বদ্ধ থেকেই সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত সমাধান সম্ভব। জনগণ যদি প্রকৃত সার্বভৌম হয়, তবে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন না ঘটলে কোনো আইন, কোনো সরকার, কোনো আদালত চিরকাল বৈধ থাকতে পারে না।

 

৩ এপ্রিল ২০২৬

 

গ্রন্থপঞ্জি 

 

আন্তর্জাতিক আইন ও দলিল

 

· United Nations. (1945). Charter of the United Nations.

· United Nations General Assembly. (1948). Universal Declaration of Human Rights. UN General Assembly. Article 21(3).

· United Nations General Assembly. (1966). International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR).

· UN Human Rights Committee. (1996). General Comment No. 25: The right to participate in public affairs, voting rights and the right of equal access to public service (Article 25). CCPR/C/21/Rev.1/Add.7.

 

আদালতের রায় (যুক্তরাষ্ট্র)

 

· Chisholm v. Georgia, 2 U.S. 419 (1793).

 

আদালতের রায় ও সাংবিধানিক নথি (ভারত)

 

· Government of India. (1950). The Constitution of India.

· Government of India. (1955). The Citizenship Act, 1955 (as amended).

· Supreme Court of India. (1973). Kesavananda Bharati v. State of Kerala, (1973) 4 SCC 225.

· Supreme Court of India. (2024). In Re Section 6A of the Citizenship Act, 1955, Judgment pronounced on October 17, 2024.

 

আইন ও সরকারি প্রক্রিয়া

 

· Ministry of Home Affairs, Government of India. (2024, March 11). Citizenship (Amendment) Rules, 2024. Notification to enforce the Citizenship Amendment Act, 2019.

· Election Commission of India. (2025). Special Intensive Revision (SIR) of Electoral Rolls in West Bengal – Official Press Notes and Guidelines.

 

সংবাদ প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ

 

· Lokmat Times. (2025, November 1). SIR: Not debate, but radicalisation of perception leads to tragedy in West Bengal.

· The Hindu. (2025, October 28). Opposition parties in West Bengal raise concern over ‘hurried’ SIR process.

· India Today. (2025, November 19). Illegal Bangladeshi Immigrants Flee Bengal Fearing Voter List Crackdown, Sparks Political Firestorm.

· The Telegraph India. (2025, October 25). Protests erupt in Bengal over fears 'Special Intensive Revision' is backdoor NRC.

· The Indian Express. (2024, October 18). On citizenship debate, SC judgment strikes an inclusive note (Editorial).

 

দার্শনিক ও তাত্ত্বিক গ্রন্থ

 

· Locke, J. (1689). Two Treatises of Government.

· Rousseau, J.-J. (1762). The Social Contract.

· Crawford, J. (2006). The Creation of States in International Law (2nd ed.). Oxford University Press.

অত্রি ভট্টাচার্য
অত্রি ভট্টাচার্য

প্রাবন্ধিক ও সংগঠক 'ঔপনিবেশিক বিরোধী চর্চা'