সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ও বাঙালি কি রবীন্দ্রনাথের আদর্শকে হারিয়ে ফেললো? এই প্রশ্নটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ আজ রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন এবং আজই বিজেপি সরকার আগামী পাঁচ বছরের জন্য বাংলা শাসনের শপথ গ্রহণ করছে। আর কিছু মানুষ যারা রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছে তারা আজ কলকাতার রাজপথে বেরিয়েছে গান,কবিতা নিয়ে। যাইহোক, আমি জানতাম বাঙালির আবেগে রবীন্দ্রনাথ,বাঙালির মননে রবীন্দ্রনাথ। আর গোটা বাংলাজুড়ে রবীন্দ্রচর্চা,রবীন্দ্র গবেষণা চলেই যাচ্ছে। কথায় কথায় বাঙালি রবীন্দ্র উক্তি টানে, কথায় কথায় বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান,কবিতা,সাহিত্য নিয়ে বাঁচে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একদা বলেছিলেন “আমরা শিক্ষাকে বহন করিয়া চলিলাম বাহন করিতে পারিলাম না।” আর এই উক্তি ধরেই অদ্ভুত ভাবে মনে হচ্ছে বাঙালির যাপনে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে আমরা বহন করে চলেছি বাহন করতে পারলাম না। ২০২৬ এর বিধান সভা নির্বাচনের দিকে যদি আলোকপাত করি তাহলে দেখতে পাবো অধিকাংশ বাঙালি বিজেপি নামক ফ্যাসিস্ট দলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। সরকারের বিজেপি এসেছে। লেখাটা পড়তে পড়তে ভাবছেন রবীন্দ্রনাথের সাথে ভোটের কি সম্পর্ক? আদতে সম্পর্ক আছে।কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে আর ফ্যাসিবাদকে একসাথে ভালোবাসা যায়না। রবীন্দ্রনাথ দেশ,কাল,সীমানার অংশ নয়। রবীন্দ্রনাথকে কাঁটাতারে আঁটকে রাখা যায় না। তিনি নিজেও সেই পথ অবলম্বন করেছেন। তিনি জাতীয়বাদকে ভালোবেছেন ঠিকই কিন্তু তিনি চেয়েছেন আন্তর্জাতিকবাদ। ফলে রবীন্দ্রনাথ আদতেই একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী মানুষ।তাই বাঙালিরা একসাথে বিজেপিকে আর রবীন্দ্রনাথ ভালোবাসতে পারেনা।বিজেপি একটি ফ্যাসিস্ট দল, আমরা যদি ফ্যাসিবাদের আধুনিক বৈশিষ্ট্যগুলো পড়ি তাহলে বুঝতে পারবো যে ফ্যাসিজমের যে বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা উচিত তার প্রতিটিই বিজেপির সাথে মিল আছে।
ভারতবর্ষে প্রথম ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহন করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।বাঙালিরা কি ভুলে যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইপো সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ফ্যাসিস্ট হিটলারের হত্যার চক্রান্তের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন।যদিও উপযুক্ত প্রমাণ না থাকায় সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর পরে মুক্তি পান।
কিন্তু সৌমেন্দ্রনাথ জার্মানি থেকে বহিস্কৃত হন।তারপর ফরাসি রাষ্টবিজ্ঞানি অঁরি বারবুসের অনুরোধে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩৭ সালে ভারতবর্ষে প্রথম ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন।ভারববর্ষে গড়ে ওঠে League against Fascism and War যার সম্পাদক ছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সভাপতি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বর্তমান ভারতের দিকে যদি আলোকপাত করি তাহলে দেখতে পাবো একটি বিকৃত জাতীয়তাবাদী দল ভারতের ক্ষমতায় এসে বহুত্ববাদী ভারতবর্ষের বৈশিষ্ট্য নষ্ট করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। তারা মাঝে মাঝে স্লোগান তুলছে ‘এক দেশ এক ভাষা’ আবার এখন বলছে ‘এক দেশ এক আইন’।
প্রতিবাদ করলেই আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ নাগরিক। বিভিন্ন কালা কানুন প্রয়োগ করা হচ্ছে।আজকের দিনে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের তৈরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে যদি তাকাই তাহলেও দেখতে পাবো সেই প্রতিষ্ঠানেও গোবলয়ের ত্রাস। অথচ রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিবাদকে ভালোবেসে একটি উদার,প্রকৃতিময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। কাউন্টার কালচার। যা আজকের দিনে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। একট সুস্থ মানুষ উন্মুক্ত পরিবেশ আর দূষণমুক্ত প্রকৃতি থেকেই গড়ে ওঠে। ফ্যাসিবাদ হল স্বাধীন মত প্রকাশের বিরোধী, মানবতা বিরোধী, শান্তি বিরোধী যুদ্ধবাজের দল এবং চরম একনায়কতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা। যা সমাজকে দূষিত করে তোলে। সাম্যবাদকে ভালোবেসে রাশিয়ার চিঠি' বইতে লিখেছেন " সোভিয়েত না আসিলে তীর্থদর্শন অসম্পূর্ণ রহিত।" কিন্তু কয়েকদিনে আমরা কি দেখলাম? দেখলাম মেহনতী মানুষের নেতা ভি.আই লেনিনের মূর্তি ভাঙ্গা হলো। আবারও সেই বিখ্যাত কথা মনে পড়ছে "ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে..."
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বমানবতার প্রতীক। তার ফলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজ থেকে প্রায় ৮৬ বছর আগেই ঔপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ,ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার বিরোধীতা করে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। যুদ্ধজিগির তোলা মানুষের বিপক্ষে আওয়াজ তুলেছিলেন। তিনি মনে করতেন যুদ্ধজিগির তোলা শাসক,উগ্রজাতীয়তাবাদী শাসক মানবতার শত্রু।তাই তিনি নিজেও বলেছিলেন “উগ্রজাতীয়তাবাদ মানব সভ্যতার শত্রু।”
রবীন্দ্রনাথ চিরদিনই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লিখেছেন।রবীন্দ্রনাথের ‘রাজাপ্রজা’,’কালান্তর’ প্রবন্ধ পড়লেই আমরা বুঝতে পারবো বৈচিত্র্যময় ভারতবর্ষে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ সমান গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বর্তমানে একটি সাম্প্রদায়িক দল সমানে হিংসা ছড়িয়ে চলেছে আর বাঙালি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে।রবীন্দ্রনাথ সব সময় সাম্রাজ্যবাদ,স্বৈরাচারিতা,ফ্যাসিবাদে,নায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন।কখনও তার লেখার দিয়ে, কখনও রাস্তায় নেমে।স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আজকের দিনেও ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি সমান ভাবেই প্রাসঙ্গিক।
অদ্ভুত সেই কবিতার লাইন “নখ যাদের তিখন নেকড়ের চেয়ে…. সভ্যের বর্বর লোভ নগ্ন করে আপন নির্লজ্জ অমানুষতা…..” অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসনের জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের জন্য নাইট উপাধি ত্যাগ ভারতীয় সভ্যতার অন্যতম দৃষ্টান্ত। বাংলায় যখন সাম্প্রদায়িকতার উত্তাল সময় ঠিক সেই সময় রাখিবন্ধনের মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন। দেশকে ভালোবেসেই মানুষের কবি একজন প্রকৃত মানুষ হয়েই বলেছিলেন " দেশ মানুষের সৃষ্টি। দেশ মৃন্ময় নয়,সে চিন্ময়। মানুষ যদি প্রকাশমান হয় তবে দেশ প্রকাশিত।... দেশ মাটিতে তৈরি নয় দেশ মানুষের তৈরি।" তাঁর প্রতিটি কর্মকাণ্ড ইতিহাস হয়ে আমাদের মনে গেঁথে আছে ঠিকই কিন্তু আমাদের যাপিত জিবনের প্র্যাকটিসে তা করছি কৈ? রবীন্দ্রজন্ম জয়ন্তী মানে শুধু একটা পাঞ্জাবি পাজামা পরে ঘাড়ে শান্তিনিকেতন ব্যাগ নিয়ে অথবা সুন্দর করে শাড়ি পরে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গান,কবিতা,নাচ নয়। বাঙালি যাপনে রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করে তাঁর প্র্যাকটিসকে বাঁচিয়ে রাখাই হল রবীন্দ্র চর্চা।
তা নাহলে আর সেই দিন বেশি দূর নয় যেদিন বাঙালি শুধু রবীন্দ্র পড়বে,রবীন্দ্রসংগীত গাইবে , কিন্তু রবীন্দ্রনাথের আদর্শকে বাংলা ও বাঙালি হারিয়ে ফেলবে।
লিখেছেন :